News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৯ নভেম্বর ২০১৭, রবিবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow বাবার থেকে প্রেমিক হতে শেখা
বাবার থেকে প্রেমিক হতে শেখা প্রিন্ট কর
শুভজিৎ বসাক, কলকাতা   
সোমবার, ১৯ জুন ২০১৭
"তুই এত প্রেমিক মানুষ হলি কি করে বল তো? আজকালকার দিনে মানুষ নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে,নিজেকে নিয়েই এত ভাবে সেখানে তুই ভাবিস এমন একজনকে নিয়ে যে তোকে খেয়ালও করে না।কেন করছিস এসব নবনীত? প্রেমিক হওয়া ভাল কিন্তু তাকে যদি কেউ না বোঝে সেখানে সরে আসা দুজনের ক্ষেত্রেই মঙ্গলজনক সেটা বোঝ"-কথাটা দেবোত্তম বলল তার বন্ধু নবনীতকে।দুজনে গিয়েছে বাবুঘাটে গঙ্গার পাড়ে বিকেলবেলাটায় ঘুরতে।কথাটা শুনে একটু হাসল নবনীত। তারপরে বলল, "চল ঐ চায়ের দোকানটায় গিয়ে বসি"।দুজনে গিয়ে বসল সেখানে।
নবনীত যে বাস রুট থেকে বাস ধরে সেখানে প্রতিদিন একজন মেয়ে দাঁড়ায় বাস ধরতে।মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে এসেও দাঁড়ায় তারফলে তার নাম ইশিতা নবনীত সেটা জেনেছে।খুব সুন্দরী না হলেও বেশ দেখতে তাকে।মাথায় চুলটা পিঠ অবধি প্রায় খোলা থাকে,মুখ দেখে বোঝা যায় যে বেশ পরিণত মানসিকতার মেয়ে সে।ভীষণ কম কথা বলে।উত্তরগুলো হ্যাঁ অথবা নাতে সাড়ে সে।সুন্দরের পূজারী আমরা অথচ সাধারণ মানুষও যে এত সুন্দর হতে পারে তা ইশিতাকে না দেখলে বোধহয় অবিশ্বাসই হয়।মনে মনে ভাল লাগলেও অত মানুষের ভীড়ে পরিচয়টুকুও করতে পারেনি এতদিনে নবনীত।নিজেকে বড় অভাগা মনে হয়।দেবোত্তম তার কাছের বন্ধু।তাকে সব বলে সে।বন্ধু যে ভাল নেই সেটা বুঝতে পেরে আজ এই কথাগুলো সে নবনীতকে বলল।
নবনীত চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, "তুই বলছিলিস না আমি এত প্রেমিক হলাম কি করে।সেটার উত্তর আমার বাবা"।
দেবোত্তম: (অবাক হয়ে) কি বলিস রে! কাকু?
নবনীত: হুম।
দেবোত্তম: (চা-টা শেষ করে আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে) একটু শোনা শুনি।
নবনীত: বাবাকে দেখতাম মাকে ভীষণ ভালবাসে।তা বলে অন্ধের মত নয়।ঝগড়া-অশান্তি,খুটখাট কথা কাটাকাটি যেমন তারা আজও করে,আগেও করত।তবে বাবা মানুষটা ভীষণ সরল আর সাধারণ।সে মাকে এত বেশী ভালবাসে যে রাগ দু'মিনিটে কমিয়ে আবার মাকে বুঝিয়ে হেসে উঠত।আমার মাকে ঐ দু'মিনিটের জন্যই বরাবর কাঁদতে দেখেছি আমি।সারাজীবন খুব আগলে রেখেছে ওরা দুজন দুজনকে।সবাই আমরা বলি প্রেম-টেম সব বাহানা।কিন্তু আমার বাবা-মাও ভালবেসে বিয়ে করেছিল এবং পঁচিশ বছর এভাবে সংসার করে চলেছে।মা খুব পরিণত মানসিকতার মানুষ।সে বাবার মন বোঝে।বাবা সরকারী অফিসে কাজ করলেও মায়ের বায়না বিশেষ কিছুই ছিল না।তাই সাধ্যের মধ্যে দুজনেই চলত আর মানুষ করেছে আমাকে।কিছুদিন আগে বাবাকে বলেছিলাম যে আজকের দিনে অ্যাডজাস্টমেন্টের ওপর সম্পর্ক টিকে থাকে আর তুমি আর মা সুন্দর,পরিণত বোঝাপড়ার মাধ্যমে সেটাকে টিকিয়ে রেখেছো।আচ্ছা বাবা এরকম সম্পর্ক কি আদৌ হয় আজকের দিনে?
ততক্ষণে চা এসে গিয়েছে দ্বিতীয়বার।চা তুলে চুমুক দিয়ে দেবোত্তম বলল, "তা কি বললেন উনি?"
নবনীত: বেশ ভাল একটা কথা বলল বাবা। "সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে এই কথাটা তো আমরা সবাই জানি।কিন্তু সংসারটা কি খালি রমণীর কাঁধে ঠেললেই হয়? সংসার মানে সেখানে ছোট-ছোট কথা,অনুভূতি,ঝগড়া,অশান্তি আবার তাদের মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে চলতেও জানতে হবে।তোর মা ভীষণ পরিণত মানসিকতার মহিলা।এরা মনের ভাব প্রকাশ করে না সহজে।কিছু বললে মনে পুষে রাখে আর যদি কাছের মানুষ পায় তার কাছে মুখ গুঁজে কাঁদবে।আমি তোর মায়ের সেই কাছের মানুষটি হতে চেয়েছি বরাবর আর সে নিরাশ করেনি।সংসারের খুঁটিনাটি তোর মা যা বোঝে আমি আজও বোধহয় বুঝতে পারিনি"।ঠিক সেইসময়ে মা ঘরে ঢুকে বলল, "কে বলেছে পারোনি? যদি মনে করো আমি পরিণত মানসিকতার মানুষ এবং কি আমার ভাল লাগা তা আমি চুপ থাকলেও বুঝে নাও তবে তুমিও তো সংসার বুঝেছো।সংসারে তুমিও আছো আর সুখী হয়েছে আমাদের দুজনের গুণে"।এবার বুঝলি কিভাবে আমি এত প্রেমিক স্বভাবী হলাম?
দেবোত্তম: হুম বুঝলাম।কিন্তু.....
নবনীত: (তাকে থামিয়ে) আর কোনও কিন্তু নয়।চল গঙ্গার পাড়টায় গিয়ে বসি।সূর্যাস্ত দেখব চল।
টাকা মিটিয়ে দুই বন্ধু চলল গঙ্গার দিকে আর দেবোত্তম দেখছে তার পরিণত বন্ধুটিকে যে স্বভাবে মিশুকে,একটু মনের মত মানুষ পেলে কথা বলে বেশী সে মনে মনে এতটাই পরিণতির শিক্ষায় উজ্জীবিত।সে হাসল আর মনে মনে বলল, "তোর ইচ্ছে পূরণ হোক নবনীত এটুকুই চাই।তোর মত মানুষগুলো যদি বন্ধু হয় জীবন সত্যিই ভীষণ সরল হয়ে যায়"।দুজনে গিয়ে বসল গঙ্গার পাড়ে আর দেখল বিকেলের সূর্যাস্ত।
পরদিনও সেই বাসস্টপে দাঁড়িয়ে নীরব ইশিতাকে সে দেখল।মন অনেক কিছু বলতে চায় কিন্তু ভীড়ের মাঝে হয় না আর।সে বাবা-মায়ের কথা ভেবে হাসে এইজন্য যে তখনকার দিনে সম্পর্কগুলোর সরলীকরণের কথা ভেবে।কানের পাশে চুলটা সরাতে গিয়ে ইশিতার চোখ পড়ল নবনীতের দিকে।এত গরম,ভীড় তার মাঝেও যে মানুষটা বিরক্ত না হয়ে মনে মনে হাসে সে জীবনের প্রতি স্থির এটুকু মানে ইশিতা।সেও মৃদু হাসে এবং হঠাৎ সেটা চোখে পড়ে নবনীতের।বুকটা ধরাস করে ওঠে তার কিন্তু সামলে নেয় নিজেকে।এরপর বাস আসে।ভীড় বাসের গেটে ঝুলতে ঝুলতে যায় নবনীত।তবু আজও উত্তর মেলে না।আদৌ মিলবে কিনা সেটা পরিণত মনসিকতার নবনীতও জানে না আর।তবু বাঁচে উত্তরের খোঁজে যদি পায় দিশা।হু-হু করে বাসটা ছুটে চলেছে সামনের দিকে।
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ১৯ জুন ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >

পাঠক পছন্দ

Free Joomla Templates