News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৯ নভেম্বর ২০১৭, রবিবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow লাশ দেখে, বুটুস কাঁদে
লাশ দেখে, বুটুস কাঁদে প্রিন্ট কর
সফিকুল ইস্প্লাম। মেরিল্যান্ড   
সোমবার, ১৯ জুন ২০১৭

বুটুসের বয়স মাত্র সাত । যে জায়গায় সে দাঁড়িয়ে, সেই জায়গায় বারান্দার উচ্চতা বুটুসের থুতনির সমান । উঠোনে দাঁড়িয়ে বারান্দায় থুঁতনিটা রেখে এক বিস্ময়-বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক জড় পদার্থের দিকে । চেহারায় কষ্টের এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি । মাত্র গতকালই ছিল সেই লাশ নামের জড় পদার্থটি জীবন্ত । মাঝে-মাঝে ঘরের ভিতর থেকে গোঙানি-কান্ন ।

কান্নার রোল বেড়ে যায় নতুন কেউ একজন বাসায় ঢোকার সাথে-সাথে । কিছুক্ষন দাপা-দাপি এবং মাতম চলে আবার গোঙানির রূপ ধারণ করে । এক সময় না পেড়ে বুটুসের চোখ দিয়ে পানি নিস্বব্দে থুতনি ছুঁয়ে বারান্দায় গড়ালো  । মাঝে-মাঝে নীরবে সে চোখ মুঝছে । বুটুসের বন্ধু অপু, তার মা মারা গিয়েছে সকালে।।  অপুকে দেখে মনে হচ্ছে সে তখনি কাঁদছে যখন অন্য মানুষগুলো কাঁদছে । পরিবেশটা এতো দুঃখময় কারণ অপুর ভাই অথবা বোন হওয়ার কথা ছিল  । লাশের পাশেই বসে আছে অপুর বাবা অনেক দুঃখ ভাব করে ।
বুটুসের বয়স তো বেশি হয়নি, কিন্তু সে এমন করে বড়দের মতো কাঁদছে কেন ? বুটুস মৃত মহিলাকে খালা বলে ডাকতো  । খালাকে বুটুসের ভীষণ ভালো লাগতো । অপুর সাথে খেলার সুবাদে বুটুস প্রায়ই সে উনার ঘরের ভিতর গিয়েছে এবং অনেক কিছু দেখেছে  । উনি আদর করে ছেলের বন্ধুকে কাছে টেনে নিয়েছে । গত দু-বছরে বুটুস আপন মায়ের প্রতিরূপ দেখেছে এই মহিলার মধ্যে । ঘরের ভিতরে যাওয়ার সুবাদে খালার অনেক কষ্ট সে দেখেছে ।  স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় প্রায়ই অপুর সুন্দরী খালার কথা চলে আসতে শুনেছে  । বন্ধুর সাথে সেও কষ্ট পেয়েছে । কিন্তু সে তো এই বাড়িতে কষ্ট পাওয়ার জন্য আসেনি  । তাই পরক্ষনেই আবার খেলায় মেতে উঠেছে ।
কিন্তু সে যা দেখেছে, বহির্জগতে অদৃশ্যমান।  বাহিরে সবাই দেখছে কত ভালোবাসায় মাখানো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক  । বাহিরে সবাই আদর্শ পরিবার ভেবে কাছে এসেছে, মিশেছে | আর বুটুস দেখেছে মহিলাটির ছোট বোনের সাথে লোকটির হৃদ্যতা । সে আরো দেখেছে মহিলার মন খারাপ আর ঝগড়া-ঝাটি।। এতো কিছুর মধ্যেও নিজের ছেলে আর তার বন্ধুর প্রতি আদর আর ভালবাসার কমতি ছিলোনা  । অন্যের ছেলেকে আপন করে নেওয়ার এক খাঁটি আদর আর ভালোবাসা ।  বুটুস তার মাকে বলেছে কিন্তু উনি বকা দিয়ে বলেছেন, “তুই কি বলছিস ? আমরা তো তেমন কিছু দেখছিনা । পাঁকা ছেলে কোথাকার ?” । আপন মায়ের উত্তর, “সকল পরিবারে একটু-আধটু ঝামেলা থাকে” । বুটুসের এই ছোট মগজে সংসারের এই কঠিন সমীকরণ ঢুকেনা । শুধু বড়দের মতো ভাবতো মৃত মহিলার কথা  । নিজের ছোট বোনকে কত বাধা দিবে, স্বামীকে কত বকা দেবে  ।
বুটুস দাঁড়িয়ে অনেক কিছু মনে করছে আর চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে  । সে যখন শুনেছিলো অপুর ভাই অথবা বোন হবে তখন বন্ধুর সাথে-সাথে সেও খুশি হয়েছিল | হয়তো এই ভেবে আরেক জন খেলার সাথী হবে  । কিন্তু নতুন শিশু খেলার সাথী হতে হতে সে যে বড় হয়ে যাবে, সেটাকে কি সে বুঝে ? গতকাল ও সে এই বাসায় এসেছিলো, অপুর মাকে ব্যথায় আঁকুতি-কাঁকুতি করতে দেখেছে | এক পাড়ার দাদী, অপুর বাবাকে বলেছে হাসপাতালে নিয়ে যেতে  । লোকটি বলেছে, সে কাজ থেকে এসে অত্যন্ত ক্লান্ত, একটু পরে হাসপাতালে নিয়ে যাবে | পরে জানা গেলো হাসপাতালে আর যাওয়া হয়নি  । লোকটি কি এই পরিণতি আশা করছিলো? অপুর খালা এই মাত্র এসেছে | অপুর বাবার লোক দেখানো দুঃখের মাঝে ভিতরের হাসি বুটুসের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে নাই | বুটুসের কাছে অপুর বাবাকে কসাই মনে হচ্ছে  ।
অপুর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, অনেক গুরুজন কানা-কানি করছে অপুর খালা আর অপুর বাবার বিয়ের কথা নিয়ে |  এই বিষয়টা নিয়ে এই সময়ে আলোচনা বুটুসকে কষ্ট দিচ্ছে | সমাজের অন্যান্য সবাই কি দেখছে, বুটুস যা দেখছে ? যারা সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত তারা কিছুক্ষনের মধ্যে চলে যাবে | সকল সমাধানের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে অপু | অপু মনে হয়না অনেক কিছু বুঝছে | তার দুঃখের মাত্রাটা কম  । ভাবখানা যেন এক মা  গেছে আর আরেক মা আসবে | বুটুস তার বন্ধু অপুর কানে-কানে বললো, "আমি এরপর থেকে তোদের বাসায় আসলে কষ্ট পাব | তুই ই আমাদের বাসায় আসবি  । আমি আর তোদের বাসায় আসবনা" ।

ম্যারিওটসভিল, মেরিল্যান্ড, ২৯সে মে, ২০১৭

সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ১৯ জুন ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >

পাঠক পছন্দ

Free Joomla Templates