News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow সমাজের নিষ্ঠ ভাষাচিত্র
সমাজের নিষ্ঠ ভাষাচিত্র প্রিন্ট কর
বিশ্বজিৎ ঘোষ   
সোমবার, ২৯ মে ২০১৭
আবুল মনসুর আহমদের গল্প

আবুল মনসুর আহমদ (৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮-১৮ মার্চ ১৯৭৯)

বাংলাদেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, আইন এবং সমাজ-সংস্কৃতির ভুবনে এক বিশিষ্ট ও উজ্জ্বল নাম আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯)। অবিভক্ত বাংলায় তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত এক সাহিত্যিক-সাংবাদিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও কথাকোবিদ হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী। তবে গল্প-উপন্যাস রচনাতেই তাঁর সিদ্ধি শীর্ষবিন্দুস্পর্শী। এই লেখায় মূলত আমরা তাঁর গল্প নিয়েই আলোচনা করব। ব্যঙ্গ-সাহিত্য রচনা এক দুরূহ কাজ। বাংলা সাহিত্যে যে কজন ব্যঙ্গ-সাহিত্য রচনা করে সার্থকতা অর্জন করেছেন, আবুল মনসুর আহমদ তাঁদের অন্যতম। তাঁর ব্যঙ্গ কেবল নির্মল হাস্যরচনা নয়, এর পশ্চাতে আছে অসংগতি-সমতা-ধর্মান্ধতাপূর্ণ সমাজে সামাজিক দায়বদ্ধতার টান। প্রসঙ্গত প্রণিধানযোগ্য আয়না গল্পগ্রন্থের উৎসর্গপত্র। বন্ধু আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে উৎসর্গপত্রে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন এই কথা: ‘বন্ধুরা বল্ছেন, এই বইয়ে আমি সবাইকে খুব হাসিয়েছি। কিন্তু এই হাসির পেছনে যে কথাটা কান্না লুকানো আছে, তা তুমি যেমন জান, তেমন আর কেউ জানে না’ (আবুল মনসুর আহমদ, ১৯৪৮: উৎসর্গপত্র)। আমাদের সমাজে প্রচলিত নানামাত্রিক ভণ্ডামি তীব্র ভাষায় তুলে ধরাই আবুল মনসুর আহমদের গল্পের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় আয়নার মুখবন্ধ হিসেবে সংযোজিত কাজী নজরুল ইসলামের এই বিশ্লেষণ: ‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়, কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরী করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে-সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে।’
ছোটগল্পের আবুল মনসুর আহমদ প্রধানত ব্যঙ্গ-রচয়িতা। তাঁর ছোটগল্পে ব্যঙ্গ-রসের প্রাধান্য বিশেষভাবে লক্ষ করা যাবে। মুসলিম সমাজে প্রচল নানামাত্রিক কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা, ধর্ম ব্যবসায়ীর ভণ্ডামি ও পীর প্রথার ভয়ংকরতা আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্পে পৌনঃপুনিকভাবে শিল্পিতা পেয়েছে। রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে তিনি নির্দেশ করতে চেয়েছেন সামাজিক অসংগতি এবং একই সঙ্গে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন এসব অসংগতি থেকে মানুষের মুক্তির। তাঁর রঙ্গ-ব্যঙ্গের সঙ্গে কখনো মিলেছে করুণ হাস্যরস, কখনো-বা বৈদগ্ধ্যপূর্ণ পরিহাস। সামাজিক অসংগতি আর ভণ্ডামি প্রকাশে তিনি ভয় পাননি, বরং নিজের কথাটি বলেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। কাজটা যে খুব সহজ ছিল না, তা সহজেই অনুমেয়। সামাজিক চাপটা তিনি সামলেছেন, অন্যদিকে নজর দিয়েছেন শিল্পের প্রতিও। কথাটাকে শিল্প করে তুলতেও তিনি রেখেছেন নৈপুণ্যের স্বাক্ষর। দ্রোহী মানসতার আন্তরগরজে হাসির আয়ুধ দিয়ে তিনি ধমকে দিয়েছেন ভয়াল ভয়ংকর আর সামাজিক রক্তচক্ষুকে।
এই লেখকের ছোটগল্প-সংকলনের সংখ্যা চার আয়না (১৯৩৫), ফুড কনফারেন্স (১৯৪৮), আসমানী পর্দা (১৯৫৬) ও গালিভরের সফরনামা (১৯৫৬। চার বইয়ে সংকলিত গল্পের সংখ্যা আটাশ। ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে রচিত এসব গল্পে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ছবিটি বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধরা দিয়েছে। তাঁর ছোটগল্পের আর একটি বড় বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন মিলিত বাঙালির, সেখানে স্থান পায়নি ক্ষুদ্র কোনো সম্প্রদায়ভাবনা। ‘হুযুর কেবলা’, ‘গো দেওতা-কা দেশ’, ‘ধর্মরাজ’, ‘ফুড কনফারেন্স’, ‘লঙ্গরখানা’, ‘রিলিফ ওয়ার্ক’, ‘আসমানী পর্দা’, ‘আহলে সুন্নত’, ‘আদুভাই’, ‘নিমক হারাম’, ‘গালিভরের সফরনামা’—এসব গল্প আবুল মনসুর আহমদের ছোটগাল্পিক শিল্প প্রতিভাকে নির্ভুলভাবে ধরে রেখেছে।
‘হুযুর কেবলা’ গল্পে বাংলাদেশের গ্রামজীবনে প্রবলভাবে জেঁকে বসা পীর ব্যবসার বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। এক ভণ্ড পীর, পীরের কতিপয় সাগরেদ, তাদের ভণ্ডামি ও মিথ্যাচার, পীরের রিরংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার শঠ-কৌশল এবং এক প্রতিবাদী যুবকের আখ্যান শিল্পিত হয়েছে এ গল্পে। উপরন্তু, গল্পটিতে আবুল মনসুরের আত্মজৈবনিকতার সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। দ্রোহী যুবক এমদাদের সঙ্গেও তাঁর খানিকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর মতোই এমদাদ দর্শনের শিক্ষার্থী, তাঁর মতোই রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তি। সমাজে প্রচলিত পীর প্রথার ভয়ংকরতা যেভাবে এই গল্পে শিল্পিতা পেয়েছে, তা একটা ব্যাধি থেকে মুক্তির বাসনায় আকুল। মিথ্যাচার, ভণ্ডামি ও ধর্ম ব্যবসায়ীর অপকৌশল থেকে সমাজ এখনো মুক্ত হয়নি। তাই উত্তরকালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে লিখতে হয়েছে বুঝি লালসালুর (১৯৪৮) মতো উপন্যাস। লালসালুর মজিদ ‘হুযুর কেবলা’ গল্পের ভণ্ড পীরেরই উত্তর-প্রতিনিধি যেন।
মুসলিম সমাজের পাশাপাশি হিন্দু সমাজের ধর্মান্ধতা নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক গল্প লিখেছেন আবুল মনসুর। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘গো-দেওতা-কা দেশ’ গল্পের কথা স্মরণ করা যায়। গো-হত্যা রোধ আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক ভেদ সৃষ্টির জন্য ইংরেজদের অপকৌশল, দাঙ্গা ইত্যাদি বিষয় লেখক ব্যঙ্গের আধারে এ গল্পে তুলে ধরেছেন। ‘ধর্মরাজ্য’ গল্পে প্রকাশিত হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রচলিত নানামাত্রিক ধর্মান্ধতা প্রসঙ্গ।
তেতাল্লিশের মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে আবুল মনসুর রচনা করেন বিখ্যাত ছোটগল্প ‘ফুড কনফারেন্স’। দুর্ভিক্ষের সময় বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের নানামাত্রিক স্বার্থচেতনা এ গল্পে ব্যঙ্গের আশ্রয়ে শিল্পিতা পেয়েছে। ‘লঙ্গরখানা’ কিংবা ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ গল্পেও আছে মানবিক বিপর্যয়ের সময় সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বার্থচেতনার ব্যঙ্গাত্মক চিত্র। এসব গল্পে সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। পাঠক, এ প্রসঙ্গেই আমরা স্মরণ করতে পারি তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘জনসেবা য়ুনিভার্সিটি’। ইয়াকুবের জনসেবার রূপকে লেখক এখানে তুলে ধরেছেন বাঙালির সামাজিক নেতৃত্বের স্বার্থচালিত জনসেবা-মানসতা। বাঙালির স্বার্থচেতনা, আত্মকলহ এবং অনৈক্যের কারণে স্বাধীনতা সুদূর পরাহত থাকছে—এ চেতনা লেখক ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি গল্পে।
‘আহলে সুন্নত’ ও ‘আদু ভাই’ আবুল মনসুরের গল্পসাহিত্যে নির্মল হাস্যরস সৃষ্টির দৃষ্টান্ত হিসেবে দাবি করতে পারে স্বতন্ত্র আসন। যদিও দুটি স্বতন্ত্র বিষয় নিয়ে রচিত হয়েছে গল্পদ্বয়, তবু নির্মল এবং চমৎকার হাস্যরস সৃষ্টির সূত্রে গল্পদ্বয় যেন দাঁড়ায় একই বিন্দুতে। হুর-প্রত্যাশী হালিম চরিত্রের মাধ্যমে সুন্নত পালনের আতিশয্য এবং পরিণতিতে উচিত শিক্ষালাভ ও মানস পরিবর্তন লেখক চিত্তাকর্ষক ভাষায় নাটকীয় ঢঙে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন ‘আহলে সুন্নত’ গল্পে। এ গল্পেও আছে লেখকের আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার উত্তাপ। ‘আদু ভাই’ আবুল মনসুরের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গল্প। এ গল্পে সমন্বয় ঘটেছে হাস্য ও করুণ রসের। কোনো মহলকে খোঁচা দেওয়া বা আক্রমণ নয়, একান্তই নির্মল হাস্যরস সৃজন এ গল্পের মূল উদ্দেশ্য। আদু ভাইয়ের নির্মম পরিণতি বাঙালি পাঠকচিত্তকে গভীরভাবে সিক্ত করেছে, এর স্নিগ্ধ করুণ হাস্যরস বাঙালিচিত্তে সঞ্চার করেছে হৃদয় নিংড়ানো অকৃত্রিম সহানুভূতি।
আবুল মনসুরের ছোটগল্প বাঙালি সমাজের নানামাত্রিক স্বার্থচেতনা ও ভণ্ডামির নির্ভুল আয়না। সমাজপতিদের তিনি যেভাবে আক্রমণ করেছেন, যেভাবে তিনি উন্মোচন করেছেন সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় নেতৃত্বের মুখোশ, তা রীতিমতো দুঃসাহসিক। সত্য প্রকাশে ভয় পাননি এ লেখক, বরং হাসির মধ্য দিয়ে তিনি ধমকে দিয়েছেন ভয়ংকরকে এবং এ কারণেই তাঁর গল্প হয়ে উঠেছে সমাজের নিষ্ঠ ভাষাচিত্র।
ছোটগল্পে বিষয়ের পাশাপাশি ভাষা-নির্মাণ ও উপস্থাপন-কৌশলেও আবুল নিজস্বতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রকরণ-সংগঠনে সূক্ষ্ম কারুকাজ তাঁর ছোটগল্পকে শিল্প-সার্থকতায় বিমণ্ডিত করেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘হুযুর কেবলা’ গল্পটি স্মরণ করা যাক। শব্দ ব্যবহারে তিনি এখানে সচেতন ও পরীক্ষাপ্রিয়। গল্পে দেখা যায়, ‘হুযুর কেবলা’র সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে প্রচুর অপ্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ, যা মুরিদদের বিভ্রান্ত করতে ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারেও লেখক দেখিয়েছেন মুনশিয়ানার পরিচয়। প্রসঙ্গত, স্মরণীয় অসহযোগ আন্দোলনে এমদাদের যোগদান প্রসঙ্গটি। লেখক জানাচ্ছেন, এমদাদ ‘...ফ্লেক্সের ব্রাউন রঙের পম্পশুগুলি বাবুর্চিখানার বঁটি দিয়া কোপাইয়া ইলশাকাটা করিল...।’ এখানে ইলশাকাটা শব্দের নিপুণ ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো।
রাজনীতি-সতর্ক ও সমাজ-সচেতন লেখক আবুল মনসুর আহমদ তাঁর গল্পে রঙ্গ-ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মাধ্যমে সমাজের নানামাত্রিক গলদ, অসংগতি ও ভণ্ডামি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। যেসব অপপ্রথার বিরুদ্ধে তিনি লেখনী চালনা করেছেন, সেসব অপপ্রথা এখনো আমাদের সমাজে বিদ্যমান, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বেড়েছে বলেই মনে হয়। তাই আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্প এখন আমাদের কাছে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
অব্যাহত এই প্রাসঙ্গিকতাই আবুল মনসুর আহমদের রচনার প্রধান শিল্প-সার্থকতা। প্রসঙ্গত কাজী নজরুল ইসলামের অভিমত দিয়েই শেষ করি এই লেখাটি: ‘...হাসির পিছনে যে অশ্রু আছে,...কামড়ের পিছনে যে দরদ আছে, তা যাঁরা ধরতে পারবেন, আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের সত্যিকার রসোপলব্ধি করতে পারবেন তাঁরাই। বন্ধুবরের এ রসাঘাত কশাঘাতেরই মত তীব্র ও ঝাঁঝালো। কাজেই এ-রসাঘাতের উদ্দেশ্য সফল হবে, এটা নিশ্চয়ই আশা করা যেতে পারে।’
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ২৯ মে ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

পরে >
Free Joomla Templates