News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

৩০ মে ২০১৭, মঙ্গলবার      
মূলপাতা
কাজী আরিফ : আমরা কি তাঁকে ভুলে যাবো? প্রিন্ট কর
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, টরন্টো থেকে   
সোমবার, ০১ মে ২০১৭

‘আমাদের বাংলা কবিতা শুধুমাত্র কবিতার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। সেই গণ্ডি পেরিয়ে কবিতা এখন অনেক কিছুতেই রূপান্তরিত হচ্ছে। কবিতা অবলম্বনে চিত্র, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র প্রভৃতির মাধ্যমে কবিতা তার ক্ষেত্র অনেকাংশে বৃদ্ধি করছে। ফলে কবিতা স্থান পাচ্ছে ক্যানভাসে, কার্ডে, কণ্ঠে, ক্যাসেটে, ক্যালেন্ডারে এমনকি ভ্যানেটি ব্যাগেও।’ এ কথা লিখেছিলাম সুচীপত্রের তৃতীয় সংখ্যায়,পরের ধনে পোদ্দারী  নামে একটি লেখায়, সেই ১৯৮৯ সালে। এই কথার সূত্রেই কাজী আরিফের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা। আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগের কথা। আবৃত্তিকারদের কবিতা বিকৃতি করার উপর লেখা এই নিবন্ধটি ছাপা হবার পর আমার বন্ধু রূপা চক্রবর্তী ‘রাগ’ করেছিলেন আর ‘অনুরাগে’ খুশি হয়েছিলেন কাজী আরিফ, আরিফ ভাই। আমি তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করি। নিজের ফোন নাই। পত্রিকার সম্পাদক আরেফিন বাদলের কাছে ফোন করে আমাকে চাইলেন। হাসতে হাসতে বললেন, আমি আরিফ পোদ্দার বলছি।

প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে আসল পরিচয় দিয়ে মজা করে বললেন, ‘তোমার দেখাটা পড়লাম। তথ্যবহুল। ভালো লেগেছে। আসলেই আবৃত্তিকারেরা পরজীবী, পোদ্দার। কবিরা জোদ্দার! খুব ভালো লিখেছো।’

আমি একটু চমকে গেলাম। আমি আবৃত্তিকারদের ‘পোদ্দার’ বলেছি। আরিফ ভাইর রূপা’র মতো ক্ষেপার কথা। কিন্তু তিনি স্বাভাবিকভাবে আসল বিষয়টা ধরতে পেরেছেন। তারপর দেখা হলেই মজা করে বলতেন, আমি আরিফ পোদ্দার।

সেদিন জবাবে বলেছিলাম, সিকানদার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতায় কোথাও ‘শালা’ শব্দটি নেই। সেদিন বৃটিশ কাউন্সিলে আমি আর ফরিদ কবির এক আবৃত্তির অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি, তারা সেই কবিতায় বেশ কয়েক জায়গায় ‘শালা’ ব্যবহার করছে।

-কেনো?

প্রতি-উত্তরে তাদের একাধিক যুক্তিসহ ভাষ্য, প্রথমত, ‘শালা’ শব্দটি কবিতার শক্তি বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, এক ফাঁকে পাকিদের একটু ‘গালি’ও দেয়া হলো। তৃতীয়ত, কবিতা কম্পোজ করার সময় ইমেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে সামান্য একটু পরিমার্জন করা হয়। সেজন্যই এই ‘শালা’ লেখা।

আরিফ ভাইয়ের হাসি আর থামে না। সেই নির্মল হাসি আজো কানে বাজে!

২.

বিটিভিতে আমার উপস্থাপিত ‘দৃষ্টি এবং সৃষ্টি’ অনুষ্ঠানের একটি পর্ব ‘আবৃত্তি’র উপর সাজাই। তাতে চারজন আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন- গোলাম মোস্তফা, আসাদুজ্জামান নূর, প্রজ্ঞা লাবণী এবং কাজী আরিফ।

আরিফ ভাইকে ফোন করতেই হো হো করে বললেন, অনুষ্ঠানের নাম দাও- ‘পোদ্দার’।

আমি বললাম, এতো বছর আগের বিষয়টি এখনো ভুলেননি?

-খুব মজা পেয়েছিলাম দুলাল। জোদ্দার আর পোদ্দারের কথা ভাবলে একা একাই হাসি।

সেদিন আরিফ ভাই বিনয়ের সাথে বলেছিলেন- যেহেতু প্রজ্ঞা আছে, সেহেতু আমাকে ড্রপ দাও।

-কেনো?

-দু’জন এক সাথে থাকতে চাই না।

-তাতে কি? যার যার ক্ষেত্রে সেই সেই। এখানে তো স্বামী-স্ত্রী বিষয়টি অবান্তর।

-তবু। ভালো দেখা যায় না।

কী কারণে যেনো প্রজ্ঞা ভাবী সেই পর্বে আসতে পারেননি। পরে আর রূপাকেও নিমন্ত্রণ করা হয়নি, সেই কারণেই।

আমি কানাডায় চলে আসার পর তাঁর জীবনে অনেক উল্টাপাল্টা ঘটনা ঘটে। দেশে যাবার পর একবার আড্ডা দিয়ে এলেন আজিজ মার্কেটে আমার ছোট্ট অফিসে। সেটা আড্ডা ছিলো না, ছিলো- একান্ত কিছু ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট শেয়ার করা। জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেলো, ভেঙে গেলো সংসারটা। তিনিও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছেন। প্রজ্ঞা নেই। এক মেয়ে কানাডায়, আরেক মেয়ে আমেরিকায়।

জানতে চাইলেন আমার পরবাস জীবনের কথা। কারণ, তিনিও ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত নিউ জার্সিতে প্রবাসী ছিলেন। প্রবাস জীবন অনেক বেদনার। তবু ছোট মেয়ে আনুসূয়ার জন্য আবার ফিরে যেতে চান। কিন্তু স্বদেশের শেকড় তাকে ছাড়তে চায় না। এই সব...

যা হোক। ১৯৭৯ সালে প্রথম বের হয় তার প্রথম আবৃত্তির ক্যাসেট। আমি সেই ক্যাসেট নিয়ে সাপ্তাহিক পূর্বাণীতে লিখেছিলাম। তারপর তার আরো ১১টি ক্যাসেড-সিডি বেরিয়েছে। অপরদিকে আমি, মাহমুদ মান্নান আর ফরিদ কবির আমরা ‘ছোটকাগজ’ থেকে সম্ভবত ১৯৮৪ সালে প্রথম কবিদের স্বকন্ঠে কবিতার ক্যাসেট বের করি। সেই ক্যাসেট নিয়ে আরিফ ভাই একটা লেখাও লিখেছিলেন।

আমরা রেডিওতেও একসাথে অনেক প্রোগ্রাম করেছি। আন্দোলন করেছি। একসাথে অনেক পথ হেঁটেছি। এই ভাবে একই সময়ে আমরা এগিয়ে গেছি। সেই আশির দশক থেকে অদ্যাধি। কিন্তু তাঁর সাথে কোনো ছবি নেই। আছে শুধু অজস্র স্মৃতি।

‘মনে পড়লো চৈত্র সংক্রান্তির কথা। হারিয়ে যাওয়া দিনটিকে নতুন সাজে সাজিয়ে নগরজীবনে যুক্ত করে রাজধানীতে উপস্থাপন করছিলেন এক আবৃত্তিকার দম্পতি। চৈত্রের শেষ দিন আর বৈশাখের প্রথম দিনের সন্ধিক্ষণে ইন্দিরা বোড়ে আরিফ-প্রজ্ঞার বাড়িতে সন্ধ্যা-সকাল বসতো চৈত্র সংক্রান্তির জমজমাট আড্ডাসর। যা মুখরিত হয়ে উঠতো প্রায় সকল সাংস্কৃতিককর্মীর আনন্দঘন পদচারণায়’। (দ্রঃ রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশের সূচনা/ সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল | বিডি আর্টস, ১৪ এপ্রিল ২০১১)।

আহ, কি মধুর সেই উৎসবমুখরিত সময়গুলো! এখন কোথায় সেই কাজী আরিফ, কোথায় প্রজ্ঞা লাবণী আর কোথায় আমরা?

চৈত্র সংক্রান্তির সেই স্মৃতিচারণ করে গত ১৩ এপ্রিল ফেইসবুকে একটি স্যাটাস দিয়েছিলাম। সেই কথা অসুস্থ আরিফ ভাইকে জানান টরন্টোর আবৃত্তিকার আহমেদ হোসেন। তখন আরিফ ভাই আহমেদকে বলেছিলেন, ‘দুলালকে কল দিতে বলো ‘

দু’দিন পরে তাঁর ৬৩১ ৫৬৮ ৯২০১ নম্বরে ফোন করে বলি, ‘আরিফ ভাই, আপনার আর আমার সেল ফোনের মাঝখানের তিন ডিজিট (৫৬৮) একই।’

-হ্যাঁ, আমাদের অন্তরের মিল।

তারপর আমাদের উল্টাপাল্টা দ্বিপাক্ষিক মিনি টেলিআড্ডা। বললেন, নিউ ইয়র্কে চলে আসো। শেষ দেখা হোক।

-দূর আরিফ ভাই, কি যে বলেন!

পরে তাঁকে আবৃত্তিসংক্রান্ত একটা জোকস বললাম। এক পোদ্দার (আবৃত্তিকার) সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’ আবৃত্তি করার সময় ‘টাইম-এডিট’ করে বললো- ‘৪০ বছর কেটে গেলো/ কেউ কথা রাখেনি।’

তখন এক দর্শক-শ্রোতা প্রশ্ন করলো, ‘দাদা, ৪০ বছর না তো। ৩৩ বছর হবে।’

আবৃত্তিকার জবাব দিলেন, ‘না, ৪০ বছরই ঠিক। কারণ, আমি সাত বছর আগে এই কবিতা পড়েছি।’

হাসতে হাসতে আরিফ ভাই বললেন, ‘কী ব্যাপার। এতো ভারতীয় প্রেম কেন? দেশীয়ভাবে বলো- ‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে/ চল্লিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি, দুই নয়নের জলে।’

সেই নয়ন জলের কথাই ছিলো আমাদের শেষ কথা, শেষ আড্ডা। তারপর তিনি ক’দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। এই সব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়লো, সালেম সুলেরীর কবিতাটা আরিফ ভাই যেনো মন দিয়ে আবৃত্তি করছেন-

‘যে আমি চলে যাব হারিয়ে দূর দেশে
আত্মা যাবে কই? যাবে কি ঊর্ধ্বে সে?
যে আমি শারীরিক মাংসে ভরপুর
আত্মা পালালেই সে আমি কর্পূর।’

আজ তিনি দূর দেশে, ঊর্ধ্বে সে- সুবাস ছড়ানো কর্পূর! তাঁর শেষ ইচ্ছা, উত্তরায় তাঁর মায়ের কবরে সমাহিত হওয়ার। সেই ইচ্ছা অনুযায়ী, তিনি স্বদেশের মাটিতে, মায়ের বুকে চিরনিদ্রায় শায়িত হচ্ছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, খ্যাতিমান আবৃত্তিকার, বিশিষ্ট স্থপতি কাজী আরিফ ছিলেন নাগরিক আবহে চৈত্র সংক্রান্তি এবং বসন্ত উৎসবের অন্যতম প্রবক্তা। স্মার্ট, মধুর কণ্ঠের অধিকারী, বিনয়ী, ভদ্র, মার্জিত, প্রগতিশীল, মুক্তকণ্ঠ আবৃত্তি একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা এসব গুণের মানুষটি আজ আমাদের কাছে শুধুই সাদামাটা স্মৃতি। আস্তে-ধীরে আমরা তাকে ভুলে যাবো।

তাই, গত ২৯ এপ্রিল নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের মাউন্ট সিনাই সেন্ট লিওক্স হাসপাতালে তাঁর লাইফ সাপোর্ট খুলে ডাক্তার আনুষ্ঠনিক মৃত ঘোষণার পর হাসপাতালের ছয় তলার কানায় কানায় পূর্ণ অভ্যর্থনা
 কক্ষে আরিফ ভাইয়ের ছোট মেয়ে আনুসূয়া বিনতে আরিফ মিনতি কণ্ঠে বললেন, আমার বাবাকে আপনারা ভুলে যাবেন না...
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ০১ মে ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >

লগইন বক্স






পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
সদস্য হতে চাইলে রেজিস্টার করুন

A professional services and  IT training firm.
 
  

 DETAILS 

 

 Details

Details 

Details 

 Click here for details

 

 Details 

  Details

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 অন্যান্য পত্রিকা



 


 

 

বাচিক শিল্পী কাজী আরিফের সাথে একটি অনন্য সন্ধ্যা


আমেরিকাতে এখন গ্রীষ্মের শেষ লগ্ন। হেমন্তের (ফল)এর আগমনীর প্রাক্কালে সেদিনের অপরাহ্নটি ছিল সিগ্ধ শ্যামল। গত ১১ই সেপ্টেম্বরের  এমনি এক সোনালী রোদেলা বিকেলে
ভার্জিনিয়া রাজ্যের  স্টারলিংস্থ সিনিয়র সিটিজেন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হল দেশ বরণ্য আবৃত্তি শিল্পী কাজী আরিফের আবৃত্তি সন্ধ্যা।

বিস্তারিত ...
 

২রা এপ্রিল শংকর চক্রবর্তীর মনোজ্ঞ সংগীত সন্ধ্যা


আগামী ২রা এপ্রিল  রবিবার  বিকেল চারটায় ভার্জিনিয়ার স্প্রিংফিল্ডস্থ কমফোর্ট ইন হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে  বরণ্য  নজরুল গীতি, গজল এবং হারানো দিনের আধুনিক বাংলা গানের গুনী  শিল্পী  শংকর চক্রবর্তীর একক  সংগীতানুষ্ঠান। সঙ্গত আর সংগীতের অসাধারণ ঐকতানে শংকর চক্রবর্তীর এই মনোজ্ঞ সংগীতের আসরটি  বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবে সাজানো হচ্ছে। দর্শক শ্রোতারা দারুন ভাবে উপভোগ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বিস্তারিত ...
 

কি কখন কোথায়


No events

মতামত জরিপ

Why do you visit News-Bangla
 
 
Free Joomla Templates