News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow নিথর থেকে জীবন্ত
নিথর থেকে জীবন্ত প্রিন্ট কর
সফিকুল ইস্প্লাম। মেরিল্যান্ড   
বুধবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৭

এই লেখার লেখক আমার দিকে তাকিয়ে আছে । তাকানোর ভঙ্গি দেখে আমি সতর্কিত । বিমান বন্দরে কখনো নিথরভাবে পড়ে আছি আবার কখনো দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছ।। । আমাদের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল-টাকোমা বিমান বন্দরে । আমার এবং আর ও অনেকের এই অবস্থার কারণ হলো বিমান যাত্রা বিলম্বিত । বিমান গেট এর অল্প পরিসরে সময় কাটানো ততটা সহজ না | দূরে দেখা গেলো এক ছোট্ট শিশু এডহেসিভ স্টিকার তার শরীরে আটছে আর উঠিয়ে নিচ্ছে  । এর ই ফাঁকে তার মা খাওয়া মুখে পুড়ে দিচ্ছে... হয়তো এই স্টিকার নিয়ে খেলাটা শিশুটার মা'র ই ট্রিকস, যাতে শিশুটার খাওয়াটা হয়ে যায় । একটু আগে দেখা গেলো একটি পরিবার এর চারজন দৌড়ে যেতে লাগলো কোনো একটা  গেট এর দিকে | সম্ভবত তাদের বিমান চলে যাবে  খুব শীঘ্রই... শুধু যে আমাদের বিমান ই বিলম্বিত সেটা নয় | আরো অনেকে এই সমস্যায় পড়েছেন | কাজেই পরিবেশটা  হঠাৎ হঠাৎ উত্তেজনায় ভরপূর আবার কিছুক্ষনের জন্য স্থবির ও শান্ত। ।

ঘড়ির কাটা ঠিকমতো চললেও আমার মতো যাত্রীদের দৈনন্দিন জীবনের কাটা আজ বিভ্রান্ত । কেহ কেহ সময়তাকে অর্থবহ করার জন্য ল্যাপটপ খুলে বসেছে | আবার কেহ কেহ ব্যস্ত থাকার ভান করছে | আবার অনেকে স্মার্ট ফোনকে টয় বানিয়ে সময় কাটাচ্ছে | যাদের কিছু করার নাই তারা শুধু এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছে আর সময় দেখছে | শুধু আমি লেখকের নজরে পড়ে আছি | আমরা আরো অনেকের মতো তাকিয়ে আছি সামনের বিশাল জানালার দিকে | বিমান উড়ছে আর নামছে সাঁ-সাঁ শব্দ করে | ভাবার বিষয়, আমিতো সবসময় অপাংতেয় অবস্থায় পড়েই থাকি, আমার প্রতি লেখকের এতো উৎসাহ কেন? আমি কিছুক্ষন আগে পড়ে গিয়েছিলাম | সম্ভবত সে কারণেই লেখকের দৃষ্টিতে পড়ি | আবার হতে পারে, কিছুক্ষন আগে লেখকের সাথে দেখা হয়েছিল বিশ্রামাগাড়ে | আমার গতিবিধিতো আবার সোজা না, ঠুক -ঠুক করে একে-বেঁকে চলি আমি | আগে আন্দাজ করতে হয় তারপর এগুতে হয় | ছিপছিপে লম্বা গরণ আমার, নজরে তো পড়বই |  

ভাবছি কখন থেকে লেখকের নজরে পড়েছি | হতে পারে, কিছুক্ষন আগের কথা যখন নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঢুকবো, তখন লেখক আমার নিকটেই ছিলেন | অন্যান্য দিনের মতো আজকেও এখানটায় উত্তেজনার কমতি নেই | আমার আগের লোকেরা বেল্ট, জুতা খুলছে | মানিব্যাগ, সেলফোন আর ল্যাপটপ রাখছে প্লাষ্টিক বাস্কেটে | কেউ কেউ উৎকণ্ঠার সাথে দেখছে মানিব্যাগ আর সেলফোনকে, যাতে  হারিয়ে না যায় | একটু সামনেই এক শিশু জোরে কান্না করছে | কোন উপায় নাই, তাকে তার মার কাছ থেকে আলাদা করা হয়েছে, যাতে মা এক্স-রে মেশিনের ভিতর দিয়ে যেতে পারে |  আর ও সামনের লোককে নিরাপত্তারক্ষীরা হাতিয়ে দেখছে কোন আগ্নেয়াস্ত্র অথবা বিপজ্জনক কিছু সাথে আছে কিনা |

আমি চলি আমার মণিবের সাথে সাথে | এবার আমাদের পালা | আমার মণিব ততখানি উত্তেজিত না হলেও আমাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করলো | হঠাৎ আমার ভিতরে প্রাণের সঞ্চার হল | ভিতরের স্থবির অ্যাটমিক সেলগুলো নিজ অবস্থানে থেকেই অনুভূতি জাগরণের চেষ্টা করলো | আমি দেখতেও লাগলাম অস্পষ্ট ভাবে স্পর্শেন্দ্রিয় দিয়ে | আমার এই পরিবর্তন আমাকে ভাবালো, আমি কি জীবন্ত?  বোধ হয় না | কারণ আমি অনুভব করছি আমার মণিবের ভিতরের ইচ্ছা এবং তার প্রাণের স্পন্দন | আমার মণিবের সাথে আমার এই যোগসূত্রতা, মণিবকে দেখা আর চলার সূযোগ হয়তো আমিই করে দিলাম | আমার মণিবের সাথে আমার অতি সখ্যতা | আমরা গোপন সংকেতের মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদান করি | সেই সংকেতগুলো শুধু আমরাই বুঝি | হয়তো সেই সংকেতগুলো একটি চিত্র তুলে ধরে মণিবের মনের দৃষ্টপটে | এক্স-রে মেশিনে উঠার জন্য নরম কভারএ আবৃত শক্ত কাঠামোর আন্দাজ বুঝিয়ে দেই মণিবকে | উঁচু আর নীচু অংশের বিভেদ বুঝিয়ে মনিব আর আমি ঢুকে যাই এক্স-রে মেশিনের ভিতরে | সেখানে আমাকে আলাদা করা হয় মণিবের ভিতরে এক্স-রে পাস করানোর জন্য | কি হত আমাকে ভিতরে থাকতে দিলে ? আমিতো আর কোন  ক্ষতি করতামনা | মনিব ছাড়া আমি হয়ে যাই আবার নিথর | নিরাপত্তা গন্ডি পার হয়ে তাকিয়ে দেখি লেখক ঠিকই আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছে পিছন থেকে | কথাটার অর্থ হচ্ছে, এখান থেকেই লেখক আমাদের পিছু নিয়েছে |

যাইহোক আর বেশি দেরী নেই, বিমানে উঠার সময় হয়ে গেছে | তবে একটা বিষয় পরিষ্কার যে লেখক আমাদের দিকে কটু নজরে তাকাচ্ছেনা | সুনজরই রয়েছে | আমার মণিব ও হয়তো কিছটা বুঝতে পারেন  আশে-পাশের পরিবেশ | বেড়ে গেলো বিমানের কর্মরত লোকদের তৎপরতা | তার সাথে সাথে যাত্রীদের ও উত্তেজনা | কেহ কেহ হাব-ভাব বুঝেই আগে-ভাগে বোর্ডিং পাস নম্বর অনুযায়ী লাইনএ  গিয়ে দাঁড়াল | বিমানের কর্মরত লোকদের ডাকে আমরা প্রথমেই চলে যাই লাইনের সামনে | এই পর্যায়টা ভালো লাগে কারণ আমাদের হুড়ো-হুড়ির মধ্যে পড়তে হয়না | অথবা ভীড়ের ধাক্কা সহ্য করতে হয় না |  কিছুটা সেলিব্রিটির সন্মান | আমার মণিব পাসটা এগিয়ে দিতেই গেটকিপার  একগাল হেসে আমাদের কে ভিতরে যেতে বললো | একটা অন্ধগলির মতো আঁকা-বাঁকা সরু পথ দিয়ে ঠুক-ঠুক করে এগিয়ে বিমানের সামনে চলে এলাম |  এবরো-থেবড়ো এই জায়গাটা আমার ভালো লাগেনা | আমার অনেক কষ্ট করতে হয় এখানে আবার আঘাত ও পাই |  

আস্তে আস্তে আরামের সাথে বিমানের ভিতর ঢুকতেই, এয়ার হোস্টেজ বিনয়ী চোখে তাকালো এবং মুখে সম্ভাষণ জানালো | তাদের এই আচরণ আমার ভালো লাগে এবং আমার মণিব ও আন্দাজ করতে পারে | আমি জীবনে অনেক ধরণের কাজ করেছি | আমার অনেক বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে গরিবের অতি প্রিয় থাকার ঘর ও  তৈরী করেছি | কার ও পিঠে পড়ে অসম্ভব ব্যথার অনুভূতি দিয়েছি | মিছিলে অনেকের হাতিয়ার হয়েছি | সন্তুষ্টির বিচারে এখনকার কাজ আমার সবচেয়ে প্রিয় | আমার এখনকার কাজ এই জগৎ সংসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | আমি আজ সার্থক | আমার মণিব আমাকে গুটিয়ে ছোট করে তার সীটে বসে পড়লো | আর আমার ও বিশ্রামের সময় হল | লেখক আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছে | বিশ্রামে যাওয়ার আগে আমি আমার পরিচয় দিয়ে যাই, "আমি এক লাঠি" | সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, "অন্ধের লাঠি" |   
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates