মূলপাতা arrow খবর arrow প্রবাস arrow বাঙালি সংস্কৃতি ও নববর্ষ
বাঙালি সংস্কৃতি ও নববর্ষ প্রিন্ট কর
কাজী সাইফুল ইসলাম, সৌদি আরব থেকে   
বৃহস্পতিবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৭

মানুষের আত্মপরিচয় বা মর্যাদার বাহ্যিক রূপই হচ্ছে সংস্কৃতি। মোতাহার হোসেন চৌধুরী সংস্কৃতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে—‘সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে বাঁচা, প্রকৃতি-সংসার ও মানব সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা, নর-নারীর বিচিত্র সুখ-দুঃখে বাঁচা, বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে বাঁচা, প্রচুরভাবে, গভীরভাবে বাঁচা, বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে বাঁচা।’ সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের অস্তিত্ব জড়িয়ে থাকে। জীবনকে সহজ, সুন্দর করে রাখতে মন্দের বিরুদ্ধে মানুষের যে সংগ্রাম, তাই সংস্কৃতি। জীবনসংগ্রাম, সমাজ চালিয়ে নেবার বাস্তব ব্যবস্থা, মানবসম্পদ, আচার-ব্যবহার, ধ্যানধারণা, সাহিত্য, সংগীত, চারুকলা, ধর্ম, উৎসব, খাদ্য, ক্রিয়া, মানবিকতা, জ্ঞানের উৎকর্ষ। যদি আরও ব্যাপকভাবে দেখতে যাই তাহলে সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের-জ্ঞান, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, নীতিবোধ, রীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সমষ্টিগত মনোভাব ও জাতীয় অর্জন।
হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ বঙ্গদেশে এসেছে শাসন, ধর্ম প্রচার ও ব্যবসার উদেশ্যে। এই নানান সংস্কৃতির পরস্পর বিরোধী সহাবস্থানের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে নতুন সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটিয়ে বঙ্গীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
বাঙলা নামে পরিচিত বিরাট এলাকা জুড়ে ছিল অনেকগুলো রাজ্য—গৌড়, রাঢ়, দক্ষিণ রাঢ়, সুহ্ম, বরেন্দ্রী, হরিকেল, সমতট ও বঙ্গ। গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ জয় করে ‘শাহ-ই বাঙালিয়ান’ অর্থাৎ বাঙালিদের শাহ উপাধি গ্রহণ করেন।
খাদ্য অভ্যাসে এ দেশের মানুষের মধ্যে ভাতই প্রধান। এ দেশের ধান উৎপন্ন হতো অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে। তারপর আর্য, সেন, তুর্কি, আফগান, মোগল ও শেষে ইংরেজরা বঙ্গভূমি দখল করেছে। কিন্তু বাঙালির ভাত খাবার অভ্যাস পরিবর্তন হয়নি।
১২৪০ সালে লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খলজি মুসলিম শাসন ব্যবস্থা চালু করে। খলজির পরপরই বঙ্গভূমিতে এসেছিল বহু ধর্মপ্রচারক। তখনকার সুলতানদের সহযোগিতায় ইসলাম ধর্ম ব্যাপক প্রচারণার সুযোগ পায়। স্থানীয় বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। প্রথম দুই শ বছর ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজ ব্যাপকভাবে এগিয়ে যেতে থাকে।
বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদী বৈশিষ্ট্য থেকেই মূলত বাংলা নববর্ষের সৃষ্টি। যার সূচনা করেছেন সম্রাট আকবর। বার্ষিক কর, কৃষিকর, ভূমিকর, জলকর আদায়ের উদ্দেশ্যেই বাংলা সাল প্রচলন করেন। ফসল ঘরে তুলে সব কর মিটিয়ে বছরের প্রথমে কৃষক উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে। সকল ধর্ম, বর্ণের মানুষ এক হয়ে নববর্ষের উৎসব পালন করে।
ধর্মীয় উৎসবগুলো নিজ নিজ ধর্মের মানুষের মধ্যে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্ষবরণে সকল ধর্মের মানুষের উপস্থিতি থাকে সমান। দেশের সীমানা বেরিয়ে অন্য দেশেও এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। এটা কোনো জাতি বা গোষ্ঠী অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি রয়েছে-সেখানেই বাংলা নববর্ষকে স্বাগতম জানাতে থাকে। সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সকল বাঙালিকে সমান একটি রেখায় দাঁড় করাতে পারে বাংলা নববর্ষ।
এ কারণে সম্রাট আকবর তার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনেক সুবিধা পেয়েছিলেন সকল ধর্মের মানুষের কাছ থেকে। যুগ যুগ ধরে বাঙালির বর্ষবরণে সামাজিক বন্ধন কথাই ছড়িয়ে দিয়েছে, আজও দিচ্ছে। যত দিন বাংলা পৃথিবীতে থাকবে, তত দিনই বাংলা বর্ষবরণের মধ্য দিয়ে বাঙালি তাদের সম্প্রীতি ধরে রাখবে।
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates