News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার      
মূলপাতা arrow মেয়েদের পাতা arrow প্রসংগ নারী দিবস
প্রসংগ নারী দিবস প্রিন্ট কর
সোমা বোস, ভার্জিনিয়া থেকে   
মঙ্গলবার, ০৮ মার্চ ২০১৬

নারী দিবসের জন্য এই লিখাটি আমি ব্যক্তিগত একটি কাহিনী দিয়েই শুরু করছি। সারাদিন পেসেন্ট্স দেখার পর, গতকাল গিয়েছিলাম একটা লেকচার শুনতে। এইসব শিক্ষামূলক লেকচারগুলো আমার প্রফেসানে বাধ্যতামূলক, স্টেট লাইসেন্স টিকিয়ে রাখার জন্য। এইগুলোকে বলা হয় continuing education লেকচারস। ভীষণ ভালো লাগে এই লেকচারগুলোতে অংশ নিতে। প্রথম কারণ আমার প্রফেসানের সব বনধুদের সাথে দেখা হয়ে যায় (আমার জন্য মূল কারণ), দ্বিতীয় কারণ দামী দামী সব রেস্তোরায় লেকচার শুনতে শুনতে খাওয়া দাওয়া করা, আর তৃতীয় কারণ যেটা হওয়া দরকার আসল কারণ,উক্ত অনুষ্ঠানে বক্তাদের থেকে কিছু শেখা। যাই হউক গতকালের বক্তা ছিলেন আমার পরিচিত অসাধারণ সুন্দর এক রমনী, খুব নাম করা এক cataract সার্জেন। আমাদের বাংলায় যাকে বলে "রূপে লক্ষ্মী, গুনে সরস্বতী।" প্রথমেই সে ক্ষমা চেয়ে নিল আজকের লেকচার একটু আর্লি শেষ করে দিতে হবে বলে। কারণ তার ছেলের বাস্কেটবল খেলা আছে, এবং সেখানে তার এটেন্ড করতেই হবে কারণ তার স্বামী পারছেন না এটেন্ড করতে। ছেলে চায় মা অথবা বাবা সেখানে উপস্থিত থেকে তার দলকে যেন সমর্থন করে! তিনি বললেন আমি বা আমার স্বামীর একজনের যাওয়া উচিত ছেলের খেলা এটেন্ড করতে। আমার স্বামী থাকতে পারছে না কারণ গতকাল সে একটা সার্জারি করেছে তাই আজ সে ভীষণ ক্লান্ত, তাই সে বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছে আর আমি এই লেকচারের পর যাব ছেলের খেলা দেখতে। তার স্বামীও আমাদের ডাক্তারদের মহলে অতি পরিচিত একটা নাম, সে একজন অসাধারণ retina স্পেশালিস্ট। সবাই যখন লেকচার তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে বলে আনন্দে আত্মহারা, ঠিক তখন আমার মনে কতগুলো ভাবের উদয় হলো। ভাবলাম, ঠিক আছে তার ডাক্তার স্বামী গতকাল একটা সার্জারী করে আজ ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম চাইতেই পারে, নিশ্চয়ই সেটা কোনো জটিল সার্জারী ছিল আর সেটা ছিল তার জন্য স্ট্রেসফুল, তাই তার মানসিক এবং শারীরিক বিশ্রাম অতি আবশ্যক। কিন্তু তাই বলে আমাদের মহিলা কলিগ যে আজ নিজেও দু দুটো সার্জারী শেষ করে সন্ধ্যা সাতটায় লেকচার প্রস্তুত করে আমাদের সামনে সেটা উপস্থাপন করতে এসেছেন, সে চাপটা কি তার স্বামীর থেকে কোনো অংশে কিছু কম? তার স্বামী সার্জারী করেছে গতকাল, আজ সারাদিন করেছে বিশ্রাম আর আমাদের আজকের বক্তা আজ সার্জারী করে, অফিস সামলে, লেকচার লিখে, সেটা আমাদের শুনিয়ে, দৌড়তে দৌড়তে যাবে তার ছেলের খেলা দেখতে, তাকে সমর্থন করতে! এই না হলে নারী? তার সার্জেন স্বামী ইচ্ছে করলেই কি পারত না তার স্ত্রীর প্রতি একটু সহনশীল হতে? উনি কি ইচ্ছে করলেই বলতে পারতেন না, "তোমার আজ অনেক কাজ, আমি তো সারাদিন বাড়িতে আছিই , সন্ধ্যার সময় আমিই যাব ছেলের খেলা দেখতে, তুমি বাড়ি এসে বিশ্রাম কর।" এ সিনারি টা যদি উল্টো হত? আমরা মহিলা ডাক্তাররা কি পারতাম নিজে বাড়িতে বসে বিশ্রাম করে সারাদিনের খাটুনির পর তার স্বামীকে পাঠাতে ছেলের খেলা দেখার জন্য? আমরা নারীরা সত্যি অনেক অনেক বেশি সহনশীল, আর সহনশীল হতে আমার কোনো আপত্তি নেই , শুধু সেখানেই আপত্তি যেখানে আমাদের সহনশীলতাকে দুর্বলতা ভেবে পুরুষেরা আমাদের কোমল মনের সুযোগ নেয়! গতকালের বক্তা যতই সুন্দরী হউন না কেন,আর যতই তিনি চোখের নীচের কালো দাগ কনসিলার দিয়ে ঢাকার চেষ্টাই করুন না কেন, তার চোখে মুখে মাতৃত্বের ক্লান্তি, স্ত্রীর দায়িত্ব্য পালনের ক্লান্তি, মুছে দেয়া যে কোনো মেকাপের পক্ষেই অসম্ভব!
"সংসার সুখের হয়, রমনীর গুনে", এ বেদবাক্য শুনে শুনে বড় হয়েছি। জ্ঞানের পরিধি বাড়তে বাড়তে দেখলাম কথাটা ঠিক ১০০% সঠিক নয়। কথাটা হওয়া উচিত ছিল, সংসার সুখের হয় "মানিয়ে নিতে পারা" রমনীর গুনে। উপরের ঘটনাটা দিয়েই বোঝা যায় যে কর্মজীবী নারীর আজও ঠিক মুক্তি মেলে নি। সংসারে ভাঙ্গন ধরলে সব দোষ হয় সেই কর্মজীবী স্ত্রীদের, ছেলে মেয়েরা উচ্ছনে গেলে দোষ হয় সে কর্মজীবী মায়েদের। স্বামী উচ্ছনে গেলে "ধরে রাখতে পারে নি" বলে সমাজ আঙ্গুল তোলে সেই নারীদেরই ওপর। কাজ শেষে তরিঘরি করে ঘরে ফেরার দায় শুধু নারীর, পুরুষের নয়! কিন্তু এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তো ভাঙ্গন দেখা দেবে সোনার সংসারে! কর্মজীবী নারীদের স্বামীরা কেন গৃহস্থালীর কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না আর সারাদিন কাজের শেষে কর্মজীবী মহিলারা কেন একইরকমভাবে "সারাদিন হারভাঙ্গা খাটুনির পর ঘরে ফিরে দেখবে কেউ অপেক্ষা করে আছে" এই রোমান্টিক ভাবনায় আনন্দে টগবগ হবে না, এই প্রশ্নগুলো তোলাটাই হয়েছে তাদের জন্য কাল! প্রচিলত ধারণার ঘরকন্নার নিয়মকে চেলেঞ্জ করলেই নারীরা হয়ে যায় নারীবাদী!
যদিও অনেককাল ধরেই আমরা পুরুষকেই একমাত্র বিরুদ্ধ পক্ষ ভেবে আসছি, এই ধারনাটা কিন্তু ১০০% ঠিক নয়। আমার জানা মতে, সব পুরুষেরাই কিন্তু খাঁটি পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী নন, নারীদের মর্যাদা তারা দিতে জানেন। নারীর সুখে সুখী হওয়া, নারীর দুঃখে তাদের পাশে দাড়ানো, তাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে উত্সাহ দেওয়া, আমার পুরুষ বনধু মহলে তেমন অনেকেই আছেন।আমার পক্ষ থেকে সেই সহমর্মী পুরুষদের সেলুট জানাই। কিন্তু এখানে দুঃখের বিষয় যে এমন অনেক নারীকেই আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি বা জানি যারা হয়ত কখনো তাদের নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা থেকে, বা কখনো তাদের অপারগতা বা ঈর্ষাকাতরতা থেকে নিজে নারী হয়েও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ধারণ এবং বহন করে চলেন। জীবনের এক পর্যায়ে গিয়ে ভুলে যান যে, প্রথমত তিনি একজন নারী! নারীই যদি নারীকে না বোঝে, তার থেকে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারে? তাদেরকে বলার মত আমার কিছুই নেই! তবে রবি ঠাকুরের সুরে নারী দিবসে পুরুষদের আমি বলব,
আমি নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী ।
পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে সে নহি নহি,
হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি ।
যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সংকটে সম্পদে,
সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে,
পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে ।
আজ শুধু করি নিবেদন—
সর্বশেষ আপডেট ( মঙ্গলবার, ০৮ মার্চ ২০১৬ )
 
< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates