News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৯ নভেম্বর ২০১৭, রবিবার      
মূলপাতা arrow তরুণ-তরুণী arrow বাংলাদেশকে শুধু উন্নত হলে চলবে না, মুক্ত হতে হবে
বাংলাদেশকে শুধু উন্নত হলে চলবে না, মুক্ত হতে হবে প্রিন্ট কর
শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক   
শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি ২০১৬
স্বাগত ২০১৬। বিদায়ী বছরের একেবারে শেষে দুটি সুসংবাদ সবাইকে দেশ সম্পর্কে আরো আশাবাদী করবে। এর মধ্যে একটি হলো- উপজেলা নির্বাচন এবং অপরটি ব্লুগার রাজীব হত্যার বিচার। টুকটাক ভিন্নমত থাকলেও উপজেলা নির্বাচন আশার সঞ্চার করেছে যে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। আর রাজীব হত্যা মামলার রায়ে অনেকে অখুশি হলেও এ সত্য প্রমাণিত যে, সরকার ব্লুগার হত্যার বিচারে অনাগ্রহী নন।  নুতন বছরে জব্বর খবর হলো- খালেদা জিয়ার শিল্পমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধী নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল। আরো একটি সুসংবাদ যে, অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, চাঁন্দু মিয়ার, মানে যাকে চাঁদে দেখা গেছে, তার রায়ের রিভিউর জন্য আবেদন করবেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, পদ্মা সেতু ইত্যাকার দৃষ্টান্ত টেনে এনে আরো বলা যায়, একটি সুন্দর দেশের জন্য প্রতিটি হত্যার বিচার যেমনি দরকার, তেমনি দরকার অগ্রগতি এবং একই সঙ্গে প্রয়োজন গণতন্ত্র ও মানবিক উন্নয়ন। মানবিক উন্নয়নের কথাটা এ জন্য বললাম যে, গেল বছরের শেষ দিনে ঢাকার একটি টিভি অনুষ্ঠানে একজন সাধারণ মানুষ বললেন যে, ‘দিনে পাঁচ হাজার কথা বললে দেশের মানুষ নাকি সাড়ে তিন হাজারই মিথ্যা বলে!’
প্রায়শ এ গল্পটি আমি বলি : বাংলাদেশের একজন মানুষকে যদি বলা হয়- আপনাকে আমেরিকা বা সৌদি আরবে থাকার স্থায়ী সুযোগ দেয়া হলে আপনি কোথায় যাবেন? আমার ধারণা, নিরানব্বই শতাংশ মানুষ আমেরিকায় আসার পক্ষে মত দেবেন। এর কারণ হলো গণতন্ত্র। গণতন্ত্র আছে বলে আমেরিকা একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করে। আর গণতন্ত্রের অভাবে সৌদিরা আমাদের ‘মিসকিন’ হিসেবে ট্রিট করে। পাকিস্তান আমলের একেবারে শেষের দিকে আমি একবার আগরতলা গেলে হটাৎই আমার নিজেকে মুক্ত মনে হয়েছিল, যেন প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম। তখন ভেবেছিলাম হয়তো ‘হিন্দুস্থান’ বলে এমন মনে হয়েছে, পরে বুঝেছি আসলে তা নয়, ওটা গণতন্ত্র। গণতন্ত্র মানুষকে মুক্ত করে। বাংলাদেশকে তাই শুধু উন্নত হলেই চলবে না, মুক্ত হতে হবে এবং এ জন্য নির্ভেজাল গণতন্ত্র চাই।
মিডিয়ায় দেখলাম বাংলাদেশের ৮২% মানুষ ‘শরিয়া’ আইনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। ৮০% বলেছেন তারা অন্যদের সঙ্গে থাকতে চান না! এই সময়ে পৃথিবীতে যেসব দেশে শরিয়া চালু আছে, আর যেসব দেশে গণতন্ত্র আছে এর একটা তুলনামূলক চিত্র পাশাপাশি তুলে ধরলে মানুষের পক্ষে বুঝতে সুবিধা হতো। যে কারণে একজন মানুষ সৌদিতে থাকতে চাইবেন না, একই কারণে তিনি বাংলাদেশেও শরিয়া আইন চাইতে পারেন না। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ১৫৭ জনের শিরñেদ করেছে। ২০১৬-এর শুরুতে এক দিনে ৩৪ জনের শিরñেদ করেছে এবং এ নিয়ে বিতণ্ডায় ইরান-সৌদি আরব এখন যুদ্ধের মুখোমুখি। দুটো দেশেই ইসলাম বেশ পাকাপোক্তভাবে আছে, তবু কেন তাদের মধ্যে ঝগড়া? কারণ ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। এ যুগে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্ম অচল।
বাংলাদেশের অবস্থা অনেকটা জগাখিচুড়ির মতো, রাষ্ট্রধর্মও আছে, আবার গণতন্ত্রও আছে! অথবা কোনোটাই নাই। কারণ, ধর্ম এবং গণতন্ত্র একসঙ্গে চলে না। আর ধর্ম নিয়েই যদি থাকব, তবে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার দরকারটা কী ছিল? রাষ্ট্রে ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটলে রাজনীতি থাকে না, কারণ সবকিছু তখন ধর্মের বাতাবরণে চলে। এ জন্য মুসলিম বিশ্বে কোনো রাজনীতিক নেই। রাজা আছে, বাদশাহ আছে, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক নেই। এ জন্যও রাশিয়া-আমেরিকা মিলে ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ে যেতে পারে, আণবিক বোমা নিয়ে পাকিস্তানকে আমেরিকার পায়ের কাছে বসে থাকতে হয়! ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছিল, গণতান্ত্রিক ভারত এখন বিশ্বের ষষ্ঠ শক্তিধর দেশ, আর ধর্মভিত্তিক দেশ পাকিস্তান আজ বেঁচে আছে আমেরিকার প্রয়োজনে বা দয়ায়!
বাংলাদেশেও ধর্ম যত জেঁকে বসছে, অশান্তি ততই বাড়ছে। উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু দেশ বসতির অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবও উন্নত, কিন্তু বসবাসের অযোগ্য। প্রায় সব ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রেরই একই অবস্থা এবং ওইসব দেশের নাগরিকরা সুযোগ দিলে সবাই পশ্চিমা দেশে বা আমেরিকায় পাড়ি জমাবে। তারপরও ধর্মীয় রাষ্ট্র চাই? মাত্র গতকাল প্রগতিশীল কজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আপনার ২০ বছরের মেয়েকে একা ঢাকা, রিয়াদ, তেহরান পাঠাবেন? পাকিস্তান তো অবশ্যই নয়! উত্তরটা আমিই দিয়ে বললাম, আমি তো পাঠাবই না, আপনারাও পাঠাবেন না। তবে আমরাই কিন্তু আমাদের মেয়েটাকে লন্ডন, প্যারিস বা বার্লিনে পাঠাব। সবাই সায় দিলেন, তখন জিজ্ঞাসা করলাম, এর কারণ কি? ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ রাতে জার্মানিতে যা হয়েছে তা বলে আর কাউকে লজ্জা দিতে চাই না! কেউ হয়তো বলতে পারেন, উন্নত দেশের মানুষ কি ধর্ষণ করে না? করে, তবে ধর্ষিতা বিচার পায়। আর সৌদি আরবে প্রায়ই ধর্ষিতাকেই দণ্ডিত করা হয়। বাংলাদেশও কি সৌদি শাসন ব্যবস্থা চায়?
এক সময় দাস প্রথা ছিল। একদা সতীদাহ ছিল। এখন ওগুলো নেই, বা ওইসব ফিরিয়ে আনার কথা কেউ চিন্তা করে না। আধুনিক উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে তাই শরিয়াও অচিন্তনীয়। সমস্যা হলো, আমাদের দেশের মানুষকে কেউ এসব বোঝায় না, কিন্তু উল্টোটা যাদের বোঝানোর কথা তারা থেমে নেই, তাই ৮২% মানুষ শরিয়ার পক্ষে মত দিতে পারে। শরিয়া যে এ যুগে অচল এ কথাটা তো মানুষকে বোঝাতে হবে! গতকাল একই বৈঠকে আরো বলেছিলাম, এই মুহ‚র্তে যদি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত খুলে দিয়ে বলা হয়, লাহোর ও অমৃতসরের মানুষ ইচ্ছে করলে সব সুযোগ-সুবিধাসহ এ দেশ থেকে ও দেশে গিয়ে স্থায়ী নিবাস গড়তে পারবেন। ফলাফল বোধ করি, অমৃতসর থেকে একজন হিন্দু-শিখ লাহোর যাবেন না, মুসলমানরাও হয়তো কেউ যাবেন না, বা গেলেও সেই সংখ্যাটা হবে একেবারে নগণ্য। পক্ষান্তরে লাহোর অর্ধেক খালি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে উজ্জ্বল। এর কারণও গণতন্ত্র, কারণ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচার সুযোগ দেয়, যা ধর্ম বা কমিউনিজম দেয় না।
যা হোক, ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সুলতানা কামাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা হিন্দুদের বাড়িঘর-জমিজমা দখল করছেন। তিনি নতুন কোনো কথা বলেননি বা সত্য কথাই বলেছেন, প্রশ্নটা হলো ২০১৬-তেও কি একই ধারা চলবে?
নিউইয়র্ক; ১০ জানুয়ারি ২০১৬
শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।
সর্বশেষ আপডেট ( শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ )
 
< পূর্বে   পরে >

পাঠক পছন্দ

Free Joomla Templates