News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার      
দশম জাতীয় সংসদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা প্রিন্ট কর
আবদুল মান্নান   
বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০১৪
২৯ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে তৃতীয় বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।
এর আগে বিএনপি প্রধান বেগম জিয়াও তিন বার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন কিন’ দ্বিতীয়বার তিনি কয়েক দিনের বেশি এই পদে বহাল থাকতে পারেন নি। সেটি ১৯৯৬ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ের কথা। তিনি যে সেই সংসদের পূর্ণ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকতে চান নি তা কিন’ নয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের তোড়ে তাঁর সেই চেষ্টা ভেসে গিয়েছিল। সেই সংসদ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজন করেছিল যা ২০১১ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপনি’ বলে বাতিল ঘোষণা করেছে। সংশোধনীটি গোড়া থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। গত ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হলো তাতে বিএনপি-জামায়াতসহ তাদের মিত্রদলগুলি অংশগ্রহণ করেনি কারণ তাদের ধারণা বাতিলকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থারর অধীনে নির্বাচন না হলে তাতে তাদের পরাজয় নিশ্চিত । সংবিধানসম্মত বিধানে নির্বাচনে তাদের চরম অনীহা। বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্বাচনে না যাওয়ার পিছনে তাদের নিজস্ব যুক্তিতো ছিলই তার উপর তাদের পিছনে ইন্ধন যুগিয়েছিল দেশের এক শ্রেণীর সুশীল সমাজ, কিছু মিডিয়া আর কিছু বিদেশী শক্তি। তারা ধারণা করেছিল বিএনপি-জামায়াত মিলে দেশে এমন একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হবে যে আওয়ামী লীগ তাদের দাবি মেনে অসাংবিধানিক পন্থায় নির্বাচন দিয়ে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে দেবে। তাদের সেই ধারণা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে কারণ বিএনপি কোন আন্দোলনের দল নয় এবং দলের নেতৃত্বে রাজনীতিবিদ বলতে যাদের বুঝায় তাদের তেমন কেউও নেই। দল পরিচালিত হয় অনেকটা স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা আর বাস্তবতাবর্জিত কিছু তামাদি রাজনৈতিক ব্যক্তি দ্বারা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন দলটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও বিএনপি সঠিকঅর্থে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে নি। আর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো এখন দলটির কাঁধে সোয়ার একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত যা বিএনপি’র ভিতর ক্যান্সার ভাইরাসের মতো প্রবেশ করেছে। দ্রুত এর চিকিৎসা না হলে হয়তো দেখা যাবে বিএনপি নামক দলটির অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়েছে। তার উপর যোগ হয়েছে এই দল এখন কে চালায় সে প্রশ্ন। চিকিৎসার নামে লন্ডনে বিলাসী জীবন যাপনকারী বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক জিয়া, না ঢাকায় অবস্থানরত তার মা দলের চেয়ারপারসন বেগম জিয়া? দীর্ঘ তেইশ বছর পর এই প্রথমবার একটি জাতীয় সংসদ গঠিত হলো যেখানে বিএনপি নামক দলটির কোন প্রতিনিধি থাকলো না। অন্যদিক হতে এই সংসদ আক্ষরিক অর্থে পবিত্র কারণ জামায়াত নামক যুদ্ধাপরাধীদের দলটিও সংসদে নেই। সংসদ নির্বাচনের পূর্বে অনেকের ধারণা ছিল যে যেহেতু নির্বাচনে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি অংশগ্রহণ করছে না সেহেতু সেই নির্বাচন বা সংসদ বৈধতা পাবে না । ইতোমধ্যে তারা সকলে ভুল প্রমাণিত হয়েছেন কারণ নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ে বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ও সংস্থা নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং অঙ্গীকার করেছে তারা এই সরকারের সাথে কাজ করবে। নির্বাচনটি সংবিধানের আওতায় হয়েছিল এবং তাতে ছোট বড় মিলিয়ে বারটি দল অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনের পর বিভিন্ন মহল হতে নতুন সংসদের আয়ুষ্কাল নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আগামী জুন মাসের মধ্যে একটি সকল দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোন সময়সীমা বেঁধে না দিলেও আশা করে যত সত্বর সম্ভব এমন একটা নির্বাচন হবে তবে সেই নির্বাচনের আগে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে হবে। ভারত বাংলাদেশে একটি সি’তিশীল সরকার প্রত্যাশা করে নিজেদের স্বার্থে কারণ কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। বাংলাদেশে সংঘাত বা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হলে তার ধাক্কা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও আঘাত হানতে পারে। বিএনপি আশা করে এক বছরের মধ্যে এই সরকার বিদায় হবে এবং জনগণ তাদের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবে। আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন সংবিধান অনুযায়ী তারা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত সুতরাং আইনসংগতভাবে এই পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে তাদের কোন বাধা নেই। তারা এও জানে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করার সক্ষমতা বিএনপি’র নেই। তারা যা পারে তা হচ্ছে জামায়াত নামক সন্ত্রাসী সংগঠনটির সহায়তায় আন্দোলনের নামে দেশে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে তোলা। আর জামায়াতও এটা বুঝে রাষ্ট্র বা সরকার যদি তাদের সৃষ্ট সন্ত্রাস দমন করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয় তা হলে তারা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারবে না। আর জনগণ চায় স্বস্তি, তাদের জানমালের নিরাপত্তা আর দেশে একটি সুশাসন। বাস্তবে বর্তমান সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবে তা অনেকাংশে নির্ভর করে নতুন সরকার দেশ কেমন চালাচ্ছে তার উপর। নতুন সংসদে প্রথাগত বিরোধী দল নেই বলে অনেকে হা-হুতাশ করছেন। তারা জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে মানতে নারাজ কারণ তারা সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই আছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে মনে করা হয় ছায়া সংসদ ও সরকার। তারা প্রয়োজনে ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করবে, ভুল ভ্রান্তি ধরিয়ে দেবে এবং বিকল্প প্রস্তাব করবে। কিন’ নবম সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে কারণ তারা সংসদের মেয়াদের প্রায় পুরো সময়টুকুই সংসদে অনুপসি’ত ছিল। বিরোধী দলীয় নেত্রী ৪১৮ দিনের মধ্যে উপসি’ত ছিলেন সর্বসাকুল্যে দশ দিন যদিও তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা সংসদ সদস্য হিসেবে সকল সুযোগ-সুবিধা আর বেতন-ভাতা নিতে কার্পণ্য করেন নি। যে কয়দিন তারা নিজেদের স্বার্থে উপসি’ত ছিলেন সেই ক’দিন তারা জনস্বার্থে কোন কথা না বললেও নিজেদের ও দলীয় স্বার্থে ঝগড়া-ঝাটি করে সংসদের সময় নষ্ট করেছেন এবং আর একদিন ফিরে আসবেন বলে অধিবেশন ত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টি ঘোষণা করেছে তারা সংসদে যোগ্য বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে যদিও তাদের কয়েকজন সদস্য মন্ত্রিসভায় আছেন। দেশের মানুষ দেখতে চায় তারা অনুগত বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়ে সত্যিকার অর্থে তারা তাদের কথা রাখবেন। আর সরকারি দল যদি তাদের ভূমিকা পালনে বাধা হয় যে কোন সময় তারা সরকার থেকে পদত্যাগ করে সকলে বিরোধী দলের বেঞ্চে বসবেন। আর এই রকমের সরকার বা সংসদ বাংলাদেশ আবিষ্কার করেনি। এমন সংসদ বা বিরোধী দল দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রিটেন, ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন সময়ে ছিল। তবে এটিও ঠিক এই ধরনের ব্যবস্থা অস্বাভাবিক অবস্থায় থাকলেও তা নিয়মিত ব্যবস্থা হিসেবে থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে কোন রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে না আসে তাকে জোর করেও নির্বাচনে আনা যাবে না। মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরকে আমরা উন্নয়নের মডেল রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করতে পছন্দ করি। কিন’ সেই সব দেশে বস্তুতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে একদলীয় শাসন চলে আসছে। ইরাক বা মিশরে যুগ যুগ ধরে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা গণতন্ত্র রপ্তানি করতে চাইলে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। দেশ দুটি এখন ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার দোরগোড়ায় উপনীত। তবে এই দুটি বা অন্যান্য রাষ্ট্রে কার্যকর বহুদলীয় গণতন্ত্রের অনুপসি’তিতে সেখানে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হয়েছে। নিশ্চয় বাংলাদেশের কেউ প্রত্যাশা করেন না এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হোক। এই যে বিএনপি নির্বাচনে না গিয়ে একটি বড় ধরনের ভুল করলো তাতে তো দল হিসেবে একশতভাগ ক্ষতি তাদেরই। নির্বাচনে গেলে তাদের ভাল করার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন’ সম্ভবত সেটি বুঝার মতো ক্ষমতা তাদের ছিল না অথবা তারা বিপথে চালিত হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিরোধী দল বিরাট ভুল করেছে আর সরকারি দল তথা আওয়ামী লীগ ভুল করবে যদি তারা এই দফায় জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুশাসন দিতে না পারে। সকলে মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদকে একজন রোল মডেল নেতা হিসেবে মানেন। কিন’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তিনি একজন একনায়ক ছিলেন তবে তাঁর দেশের মানুষ তাঁকে পছন্দ করে কারণ তিনি নিজ দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করেছিলেন। শুরুতে শেখ হাসিনা একটি ক্লিন ইমেজের মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। যাদের বিরুদ্ধে সামান্যতম দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অথবা অদক্ষতার অভিযোগও ছিল তাদের তিনি তাঁর নতুন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেন নি। কেন্দ্রীয় কমিটির বেশির ভাগ সংসদ সদস্য অথবা মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সেখান হতে মন্ত্রী হয়েছেন অল্প কয়েকজন। কোন যুগ্ম সম্পাদকই মন্ত্রী হন নি। সাতজন সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে মাত্র একজন প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। বাকি একুশজন সম্পাদক পদের মাত্র চারজন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। রক্তের সম্পর্ক আছে তেমন কাউকে এই দফায় শেখ হাসিনা মন্ত্রী করেন নি। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। মন্ত্রিসভায় যেমন আছেন ঝানু অভিজ্ঞ মন্ত্রী তেমন আছেন সৈয়দ মোহসিন আলীর মতো সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সিগারেটে সুখটান দিয়ে তিন বেশ হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। ভাল দিক হচ্ছে তিনি তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মের জন্য সাংবাদিকদের ডেকে ক্ষমা চেয়েছেন। এমন আনাড়ি মন্ত্রীদের জন্য সরকার একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস’া করতে পারে। বিএনপিবিহীন জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সামনে দেশে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বড় সুযোগ এসেছে। দেশের মানুষ আশা করে বঙ্গবন্ধু কন্যা এই সুযোগের একশত ভাগ সদ্ব্যবহার করবেন। তিনি ফন্দিবাজ, ধান্ধাবাজ, টেন্ডারবাজ, দুর্নীতিবাজ আর শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাসীদের যদি দূরে রাখতে পারেন, তাদের সকল অপকর্ম যদি কঠোর হস্তে দমন করতে পারেন তা হলে ইতিহাস তাঁকে তাঁর পিতার মতো মনে রাখবে। আর এই সব কাজ করা মোটেও কঠিন নয়। প্রয়োজন সাহস এবং সদিচ্ছার যার ঘাটতি বঙ্গবন্ধু কন্যার অভাব থাকার কথা নয়। লেখক : সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ১৪ জুলাই ২০১৪ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates