News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৮ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার      
প্রভামাছ ও আমাদের সংখ্যালঘু প্রিন্ট কর
আশরাফ আহমেদ, মেরিল্যান্ড   
মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি ২০১৪
আমার স্বর্গীয় শিক্ষক অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম চৌধুরির হাত ধরে আমি এক রঙিন পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছিলাম।  তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয়ের পানির নমুনা জোগাড় করতেন ছাত্রদের সাহায্যে। তা  থকে আহরণ করা অসংখ্য জাতের ব্যাক্টেরিয়া আলাদা আলাদা ছোট ছোট কাঁচের বোতলে বংশ বৃদ্ধি করাতেন আলো’র শক্তি দিয়ে। 
শক্তি রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটিকে সালোক সংস্লেশন বা ফটোসিন্থেসিস বলা হয়। গাছের পাতার সবুজ ক্লোরোফিল এর পরিবর্তে এই সব ব্যাক্টেরিয়া তাদের বিভিন্ন জাতের ব্যাক্টেরিওক্লোরোফিল এর সাহায্যে সূর্যের আলো-কে খাবারে রূপান্তরিত করে থাকে। একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে উজ্জ্বল আলোর বাল্বের চার পাশে গোল করে সাজানো গোটা পঞ্চাশেক বোতলে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, ও কমলা রঙ এবং এসবের মিশ্রিত রঙ এর বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়া এক মনোমুগ্ধকর, রঙিন ও মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করতো। সেই গবেষণার ফলাফল বর্ণনা করে আমি দুটো গবেষণাপত্র-ও প্রকাশ করেছিলাম। আমার অভিব্যক্তিতে রঙ এর মোহনীয় সেই দৃশ্যের প্রতিফলন দেখে স্যার বলেছিলেন, আমাদের অপরিণামদর্শী কিছু কাজের জন্য প্রাণীর, এমন কি মানুষের জীবন থেকেও এই রঙ মুছে যায়। আমার চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র, তাঁর এক হিন্দু ছাত্রের অনাগত জীবন-সংগ্রামের দুশ্চিন্তা থেকেই তিনি সেই মন্তব্য করেছিলেন। পরবর্তীতে বেকার অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোর সময় হাতের নাগালে পাওয়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকের চাকুরিটি আমি জ্যেষ্ঠ সেই ছাত্রের অনুকুলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। অণুজীববিজ্ঞান ক্লাসে চৌধুরি স্যার বলেছিলেন যে সূর্য থেকে আলো নিয়েই আমাদের এই পৃথিবী ও তার সমুদয় প্রাণী বেঁচে আছে। সেই আলো-কেই আমরা, জীবিত ও নির্জীবরা, অন্য কোন শক্তিতে রূপান্তরিত করে প্রকৃতির কাছেই আবার ফেরত দেই। আবার কখনো কখনো হিংসা ও অবিমৃশ্যকারিতায় আমরা সেই শক্তিকে আগুনের মত ধংসাত্মক অবস্থায় রূপান্তরিত করে পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলি। প্রাণী যেভাবে সেই শক্তিকে আলো-তে রূপান্তরিত করে তেমন একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে বায়োলুমিনেসেন্স, বা বায়োলজিক্যাল ফ্লোরেসেন্স বা লুমিনেসেন্স। আলো হচ্ছে বিভিন্ন দৈর্ঘের একপ্রকার বৈদ্যুতিক-চৌম্বকীয় বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ-এর সমষ্টি। ফ্লোরেসেন্স প্রক্রিয়ায় কোন বস্তু অধিক শক্তিসম্পন্ন নিম্ন-দৈর্ঘের আলো, যেমন অতি বেগুণী রশ্মি, শুষে নিয়ে কম শক্তিসম্পন্ন উচ্চ-দৈর্ঘের আলো বিকীরণ করে। লুমিনেসেন্স প্রক্রিয়ায় বস্তুটি আলো শোষণ না করেও অন্য ধরণের, যেমন খাদ্য বা রাসায়নিক শক্তিকে রূপান্তরিত করে আলো বিকিরণ করতে পারে। ফ্লোরেসেন্স বা লুমিনেসেন্স এর বাংলা অনুশব্দকে ‘প্রভা’ বলা যায় কারণ প্রভা সাধারণতঃ কোন তাপ ছাড়াই আলো ছড়ায়। তাই বায়ো-লুমিনেসেন্সকে বাংলায় ‘প্রাণপ্রভা’ বলা যেতে পারে। কোন কোন প্রাণী অন্ধকারে আমাদের সচরাচর দেখতে না পাওয়া অতি বেগুণী রশ্মি শুষে নিয়ে প্রাণপ্রভা ছড়াতে পারে। চৌধুরি স্যারের ক্লাসে শিখেছিলাম, জোনাকি পোকা ছাড়াও পৃথিবীতে আরো অনেক প্রাণী আছে যারা আলোর প্রভা ছড়ায়। শিখেছিলাম এক ধরণের গুবরে পোকা হালকা সবুজ আলো ছড়ায়। আরো জেনেছিলাম সমুদ্রে অনেক মাছ আছে যারা রাতে আহারের সন্ধানে বেরোলে তাদের ঠোঁট ও জিভের চারপাশ থেকে বিচ্ছুরিত আলো দিয়ে শিকার ধরে। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে আসলে সে আলো তার নিজস্ব নয়। এক ধরণের ব্যাক্টেরিয়া মাছের ঠোঁটের চারপাশে বাসা করে, ঠোঁটে ও জিভে লেগে থাকা খাবার খেয়ে, বংশ বিস্তার করে, মাছকে কিছুটা আলো উপহার দেয়। মাছও তাই আর তার ঠোঁট ধুয়ে বা কুলি করে জিভ পরিষ্কার করার কোন চেষ্টা করে না। তেমন প্রধান এক ব্যাক্টেরিয়ার নাম ফটোব্যাক্টেরিয়াম ফিশারি। সমুদ্রে আরো আনেক আলো বিকিরণকারী প্রাণী আছে। তাদের মধ্যে নানান জাতের জেলিফিশ বিভিন্ন রঙ এর আলো ছড়ায়। নামটি যেমন, এই প্রাণীগুলোর গঠনও জেলির মত নরম। অনেক সমুদ্র সৈকতে এদের অবাধ আনাগোনা। কোন ধরণের অস্থিবিহীন নরম শরীরে শতকরা পঁচানব্বই ভাগ পানি হওয়ায় এদের স্পর্শ কোমল এবং প্রায় বর্ণহীন বলে গায়ে লাগলেও সমুদ্র স্নানকারীরা তা বুঝতে পারে না। কিন্তু জেলিফিশের কিছু বিষাক্ত দ্রব্য গায়ে লাগে বলে কিছুক্ষণের মাঝেই চুলকানির সৃষ্টি করে, যা ক্ষেত্র বিশেষে মৃত্যুর কারণও হতে পারে। আলো বিকীরণকারী তেমনি এক জেলিফিশের সবুজ আলোটি জাপানি এক বিজ্ঞানীর কৌতুহল সৃষ্টি করে। ওসামু শিমোমুরা নামের সেই বিজ্ঞানী প্রাণীটির দেহের আনাচে কোনাচে পরীক্ষা করে দেখতে পেলেন যে এর কোষের ভেতরকার দুইটি বিশেষ প্রোটিন বা আমিষ দুই ধরণের আলো ছড়ায়। প্রথমটিকে তিনি নাম দিলেন একুইরিওন, যে প্রাণপ্রভা প্রক্রিয়ায় একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে নীল আলো উৎপাদন করে। অন্য আমিষটি তখন সেই নীল আলো শুষে নিয়ে তার থেকে বড় তরঙ্গ-দৈর্ঘের সবুজ আলো বিকিরণ করে রাসায়নিক প্রভা প্রক্রিয়ায়। আলোর প্রভা উৎপাদন করে বলে আমিষ দুটোকে প্রভামিষ বলা যায়। চার দশক আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকলেও প্রাণপ্রভা’র বিষ্ময়কর রঙ এর হাতছানি থেকে এখনো রেহাই পাইনি। বিজ্ঞানী সিমোমুরা ১৯৬১ সনে যখন তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন, তখন সবুজ প্রভামিষ-টির কোন নামাকরণ তিনি করেননি। পরবর্তীতে এর নাম দেয়া হয় “গ্রিন ফ্লোরেসেণ্ট প্রোটিন” বা “জিএফপি”, বাংলায় যাকে ‘সবুজ প্রভামিষ’ বলা যেতে পারে। সেই আবিষ্কারের পর প্রায় চল্লিশ বছর কেটে গেল। সবুজ প্রভামিষ-এর এর তাবত গুণাগুণ নিয়ে অফুরন্ত গবেষণা হলো। মার্টিন শ্যাফি নামে এক বিজ্ঞানী এর গঠন-তথ্যে ভরা জিন-টি জেলিফিশ-এর ক্রোমোজম থেকে কেটে নিয়ে ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়ার ক্রোমোজম এর ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। বাহ এখন তো ব্যাক্টেরিয়াটি অন্ধকারে নিজেই সবুজ আলো ছড়াচ্ছে! তার মানে হচ্ছে প্রভামিষ-টি প্রাণীর বিভিন্ন অংগ প্রত্যংগেও ঢোকানো সম্ভব হতে পারে। চেষ্টা করেই দেখা যাক না। ওমা সে কি? ইচ্ছা করলেই ইঁদুরের লেজ থেকে নাকের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া গোঁফের শেষ মাথা পর্যন্ত যে কোন অংশ থেকেই তো দেখি সবুজ আলো বের করা যায়! অথচ ইঁদুরটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করে চলেছে। এভাবে সবুজ প্রভা বিচ্ছুরিত ব্যাঙ, খরগোস, বেড়াল, ও কুকুরও বানানো হলো। চীনের উয়ু রাজ্যের রাজা সিইয়েন লিউ’র চৌত্রিশতম বংশধর রজার সিইয়েন নামে এক প্রাণরসায়নবিদ সবুজ প্রভামিষটির বিভিন্ন স্থানে পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রায় পনেরটি উজ্জ্বল রঙ এর প্রভামিষ বানিয়ে ফেললেন। এভাবে আমরা পেলাম হলুদ প্রভামিষ বা ওয়াইএফপি, ও সোনালি বা সায়ান প্রভামিষ বা সিএফপি। মানব কল্যানে সবুজ প্রভামিষটির গুরুত্ব এতোটাই ছিল যে সিমোমুরা, শ্যাফি এবং সিয়েন বিজ্ঞানীত্রয়কে ২০০৮ সনে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলো। ইতোমধ্যে রসায়নবিদ, কোষ বিজ্ঞানী অর্থাৎ সেল বায়োলজিস্ট, পতঙ্গ বিজ্ঞানী, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, এমনকি পদার্থবিদরাও হুড়মুড় করে প্রভামিষ-টির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হাতি-ঘোড়া যখন এক দিকে যায়, তখন বনের সব কীট-পতঙ্গ-ও তাদের অনুসরণ করে। আমিও বাদ যাই কেন? নাহ, আমার কথা এখানে আর বলবো না। কিন্তু একুয়ারিয়ামে ডিগবাজি খেতে থাকা আদুরে ছোট্ট একটি মাছ দেখতে দেখতে সিঙ্গাপুরের মাছ-প্রেমী এক বিজ্ঞানীর মাথায় কৌতুহল চাপলো। ১৯৯৮ সনে তিনি জেব্রাফিশ নামের ছোট্ট সেই মাছের ভ্রুণের ভেতরে সুঁই দিয়ে জেলিফিশের প্রভামিষ জিনটি ঢুকিয়ে দিলেন। ভ্রূণগুলো শিশু অবস্থায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই ঘরের অপ্রতুল আলোয় তাদের শরীর থেকে সবুজ আলো ঠিকরে ঠিকরে বেরোতে লাগলো। শুধু তাই নয়, মানুষের কারিগরিতে উৎপন্ন এই মাছগুলো বড় হয়ে যে শিশুর জন্ম দিল আলো পেলেই তারাও সবুজ রঙ ছড়ায়! যে কেউ সুন্দর এই দৃশ্য দেখে, প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাতে থাকে। তাইনা দেখে, ব্যাবসায়ীরা এর নাম দিয়ে ফেললেন “গ্লোফিশ” বা প্রভামাছ। ফুটফুটে এই প্রভামাছ-কে ছেলেবুড়ো এতোই পছন্দ করলো যে বাজারে আসার এক মাসের মধ্যেই প্রতিটি প্রায় ১৯ ডলার দরে এক লাখের বেশি প্রভামাছ বিক্রি হয়ে গেল। এই চমকপ্রদ তথ্যগুলো জানার পর জেব্রাফিশ মাছটি সম্পর্কে খোঁজ করতে গিয়ে দেখলাম এর আদি বাসস্থান ভারতীয় উপমহাদেশের গঙ্গা অববাহিকার দক্ষিণ-পুর্বাঞ্চলে, যেখানে বাংলাদেশ অবস্থিত। দৈর্ঘ্যে ৩০ মিলিমিটার এই মাছটির গায়ে লম্বালম্বি ভাবে পাঁচটি নীল ডোরাকাটা’র মাঝে পুরুষের ক্ষেত্রে সোনালি এবং নারীর ক্ষেত্রে রূপালী রঙ এর ডোরাকাটা আছে। আমাদের ধানক্ষেত, পুকুর, খাল, স্রোতহীন নদী, বা গর্তের জমে থাকা পানিতে প্রায় সারা বছরই একা বা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। মাছটির ছবি ও আকৃতির বর্ণনা পড়ে মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম এটি তো আমার অতি আদরের দারখিনা মাছ। সাথে সাথেই “মনে পড়ে, কতনা দিন রাতি আমি ছিলেম তোমার খেলার সাথি”। ছেলেবেলায় পুকুরে গোসল করতে গিয়ে গামছা বা বালতি পানিতে ডুবালেই কখনো কখনো দলছাড়া একটি দারখিনা মাছ উঠে আসতো, আর তাতে আমাদের কি আনন্দ ও উত্তেজনা হতো! একবার একটি মাছ সহ বালতিটি বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। বালতির তলা থেকে এক ছুটে ওপরে এসেই তিড়িং করে দিক পরিবর্তন করে লেজ নাড়তে নাড়তে কোণাকোণি কিছুটা গিয়ে আবার তড়িৎ গতিতে দিক পরিবর্তন করতো। মাছটির এই ছুটাছুটির সাথে আমার হৃদয়েও এক অপার্থিব, আনন্দ-কম্পন অনুভব করতাম। খেতে পারুক বা নাই পারুক, আমরা দুই ভাই মিলে অনাথ সেই মাছটিকে নিজেদের থালা থেকে কিছুক্ষণ পরপর একটা বা দুইটা করে ঝোল মাখানো ভাতের দানা খেতে দিতাম। আমাদের অতি আদরে, মশলার ঝাঁঝেই হয়তো মাছটি মরে গিয়েছিল। সেই দুঃখ কাটিয়ে উঠতে আমার অনেক দিন লেগেছিল। বাংলাদেশে খোঁজ নিতে আমার বয়সের কাছাকাছি সবাই চিনতে পারলেও কেউই মাছটির নাম মনে করতে পারলো না। পাশ্চাত্যে পরিচিত জেব্রাফিশ মাছটি সত্যিই আমার জানা দারখিনা মাছ কিনা তা নিশ্চিত হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রধানকে ইমেইল করে কোন জবাবই পেলাম না। তেমনি জবাব পেলাম না কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জেব্রাফিশ বিশেষজ্ঞ থেকে। হয়তো বাংলাদেশে মাছটি অতি তুচ্ছ বলে আমার ইমেলটি কোন গুরুত্ব পায়নি। উইকিপেডিয়ায় দারখিনা মাছকে অনেক বড় প্রজাতির বলে দেখানো হয়েছে। পল্লীকবি জসীম উদ্দিন তাঁর বিখ্যাত “নিমন্ত্রণ” কবিতায় সম্ভবতঃ এই মাছটিকেই “ডানকানা” নামে অমরত্ব দান করেছেন। কিন্তু জেব্রাফিশ, দারখিনা এবং ডানকানা একই মাছ কিনা তার সমর্থনে বা বিরুদ্ধে লিখিত কোন তথ্যই পেলামনা। পানিতে নামলে ছোট ছোট ছেলেমেয়ের খেলার সাথি হয়ে আনন্দ দেয়া ছাড়া আমাদের দেশে এই মাছের আর কোন উপকারিতার কথা জানা নেই। মাছ হলেও ছোট বলেই হয়তো আমাদের খাবার তালিকায়ও এর স্থান নেই। তদুপরি শিশুদের মানসিক উন্নতি ও চাহিদার দিকে আমাদের কোন দৃষ্টি নেই। ফলে শিশুদের আদুরে সেই মাছটিকে যত্ন করে লালন করা তো দূরের কথা, আমরা আজ পর্যন্ত এর কোন সর্ব-স্বীকৃত একটি নামও দেই নি। প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে মাছটির জীবন-যাপন, সমাজ, সামাজিক আচরণ, আহার, জন্ম-মৃত্যু, বাসস্থান, এসবের কোন বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা আমরা করিনি এবং বিশেষ কিছু জানিও না। যৎসামান্য যা কিছু জানা আছে, তা-ও বিদেশীদের কল্যাণে। ইদানিং বছরগুলোতে কৃষিতে যে পরিমাণে সার ও পতঙ্গ-নাশক রাসায়নিক দ্রব্য ছড়ানো হচ্ছে, তাতে আমরা ছোট ও দুর্বল জাতের অনেক প্রাণীর মত এই দারখিনা-কেও বাংলাদেশ থেকে চিরতরে বিদায় দিয়ে দিয়েছি কিনা তা খোঁজ নিয়ে দেখা দরকার। অদৃষ্টের কোন ঘূর্ণিপাকে কিভাবে আমাদের অবহেলিত এই দারখিনা মাছটি পাশ্চাত্যের কোথায় কিভাবে গিয়ে পড়েছিল তা জানা যায়না। তবে সেই যাত্রাই যে মাছটির ভাগ্য বদলে দিয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। সুদর্শণ দেহ সৌষ্ঠব এর উপযোগী একটি নামও পেয়ে যায়, জেব্রাফিশ। পাশ্চাত্যের অগণিত লোকের ভালবাসায় এখন জেব্রাফিশ নামের অজস্র প্রতিষ্ঠান আমাদের দারখিনা মাছের রক্ষণাবেক্ষণ, আদর-যত্ন ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। মাছটি এখন আধুনিক স্নায়ূবিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিজ্ঞান গবেষণায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। বিজ্ঞানীরা সবুজ প্রভামিষ-টির জিন-এ সামান্য কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে তা থেকে অন্যান্য আরো নানা রঙ এর আলো বের করলেন, তা আগেই বলেছি। সেগুলো ব্যবহার করে, এবং আরো অন্য জাতের প্রভামিষ বানিয়ে মাছ-প্রেমিকরা শীঘ্রই হলুদ বা কমলা, লাল, নীল, এবং বেগুনী রঙ এর জেব্রাফিশ উৎপন্ন করে ফেললেন। একই জাতের পাঁচ রঙ এর এই মাছগুলো যখন অন্ধকার বা স্বল্পালোকিত ঘরের একুয়ারিয়ামে দলবেধে ছুটাছুটি করে তখন অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নিজের অজান্তেই আপনাকে নিয়ে যায় অজানা এক পৃথিবীতে, যেখানে শীতল-কোমল আলোর অপূর্ব সব রঙ এর খেলা চলে। ডুবুরি হয়ে সমুদ্রের অতলে না যেয়েও নিজের ঘরে সোফা বা বিছানা থেকে গভীর সমুদ্রের দৃশ্য কল্পনা করা যায়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে এই দারখিনা বা জেব্রাফিশ এবং প্রভামিষ মাছ আমাদের মত কথা বলতে পারে না; তাদের ভাষাও আমরা বুঝতে পারি না। বুঝলে ঠিকই শুনতে পেতাম, দারখিনা বলছে “হে প্রিয় বাঙালি (মানুষগন), তোমরা চক্ষু খোল, দেখ, আমাকে দেখ, তোমার প্রিয় দেশ-কে দেখ। যুগের পর যুগ ধরে তোমরা আমাকে শুধু অবহেলাই করনি, ইদানিং কালে আমাদের দেশ ছাড়াও করেছ। কিন্তু তোমরা জেনে রেখো এবং পৃথিবীর মানুষও জেনে রাখুক, আমিও বাঙালি। বাংলার ধানক্ষেত, বাংলার খাল, বাংলার বিল, বাংলার নদী, নালা, সব চষে বেড়ানো এক খাঁটি বাঙালি। বাঙালি হয়ে সারা পৃথিবীর ছেলে-বুড়ো সবাইকে আমি আনন্দ দেই রাত দিন, কিন্তু ভিনদেশে পড়ে থেকে দুঃখ আমার রয়েই যায় ”। সম্ভবতঃ এখন বাঙালি বিজ্ঞানীরাই মাছটির মুখে আমাদের বোধ্য ভাষা দিয়ে আমাদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারেন। মেরিল্যান্ড, আমেরিকা
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ১৪ জুলাই ২০১৪ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates