News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৯ নভেম্বর ২০১৭, রবিবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow ফিচার arrow যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান তাই হয়ে যান!
যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান তাই হয়ে যান! প্রিন্ট কর
ফারুক ওয়াহিদ, ক্যানেটিকাট থেকে   
মঙ্গলবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৩

“কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয়।

যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান

তাই হয়ে যান …

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।”

-পংক্তিগুলো সারা পৃথিবী কাঁপানো ঝাঁজালো একটি উচ্চ কণ্ঠের কবিতার- যে কবিতাটি ছিল মুক্তিযুদ্ধে যাবার সরাসরি আহ্বানের প্রথম কবিতা।
যে কবিতা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে- যে কবিতা পড়ে তারুণ্যকে উদ্বুদ্ধ করতো যুদ্ধে যেতে- ছড়িয়ে পড়ে কবিতাটি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে, শরণার্থী ক্যাম্পে, রণাঙ্গনের ব্যাংকারে ব্যাংকারে- মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একটি এবং একটি কবিতা পড়েই মুক্তিযোদ্ধাদের দেহে শিহরণ জেগে উঠতো রক্ত টগবগ করতো এবং হৃদয় আন্দোলিত হয়ে কাঁপন ধরিয়ে শরীরে একটা অলৌকিক শক্তি এসে যেতো এবং যার ফলে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তো হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই শিহরণ জাগা উচ্চ কণ্ঠের কবিতাটির নামই বা কি এবং কে সেই অমরত্বের কবি! এই কবিতাটির ব্যাতিক্রমধর্মী শিরোনাম হলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ এবং এর রচয়িতা হলেন কবিতার রাজকুমার কবিতার উজ্জ্বল নক্ষত্র জীবন্ত কিংবদন্তি নিভৃতচারী কবি হেলাল হাফিজ। কবিতা নিয়েই যার সংসার- কবিতা নিয়ে এবং শুধু কবিতা- কবিতাকে ভালোবেসেই যার জীবন। ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন এই বরেণ্য কবি। লেখাপড়া করেছেন নেত্রকোনা দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়, নেত্রকোনা কলেজ এবং অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে স্নাতক সম্মান কোর্সে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষে নববর্ষে ছাত্রছাত্রীরা রাজপুত্রের মত চেহারা পরিপাটি পোষাক পরিহিত শান্তশিষ্ট লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া ছেলেটিকে ‘খোকাবাবু’ নামে খেতাবে ভূষিত করেন- তখনই বাংলা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এই লাজুক ছেলে ‘খোকাবাবু’-কে নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়ই তিনি ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এর সার্বক্ষণিক সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সাল- পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান তখন তুঙ্গে- টগবগে তরুণ হেলাল হাফিজ তখন কবিতার নেশায় মগ্ন অর্থাৎ একেবারে কবিতার ঘোরের মধ্যে বাস করছেন- স্বপ্নেও যিনি কবিতা লিখতেন। রিক্সায় যাচ্ছিলেন মিছিলের জ্যামে গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়াতে (পুরাতন ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন) আটকা পড়েন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করেন (ছাত্র মিছিলের উপর গুলিবর্ষণকারী ইপিআর/পুলিশ বাহিনীর উপর ক্ষুব্ধ হয়ে) মিছিলকারীদের আরো উৎসাহ দেওয়ার জন্য এক রিক্সাচালক চিৎকার করে বলছে- “মার মার, মাইরা ফ্যালা- কিছু কিছু পেরেম আছে, যেডার জন্য মার্ডার করাও জায়েজ। মার!” রিক্সাওয়ালার এই উচ্চস্বরে কথাগুলো হেলাল হাফিজের মন ও মগজের মধ্যে দারুনভাবে গেঁথে যায়। কবিতার ঘোরে মগ্ন থাকা তরুণ হেলাল পেয়ে যান কবিতার অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান এবং লিখে ফেলেন তিন/চার পৃষ্ঠার একটি কবিতা- যে কবিতায় স্থান করে নেয় সেই বিখ্যাত পংক্তি, “কোনো কোনো প্রেম আছে, প্রেমিককে খুনী হতে হয়/ যদি কেউ ভালবেসে খুনি হতে চান/ তাই হয়ে যান/ উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।” কবিতাটি লেখার পর তিনি সেটা কবি হুমায়ুন কবিরকে দেখালে তিনি সেটা পড়ে এডিট করে এক পৃষ্ঠায় আনতে বললেন। এডিট করে এক পৃষ্ঠায় আনতে গিয়েই হেলাল হাফিজ হঠাৎ করেই কবিতার একটি চমৎকার শিরোনামও আবিষ্কার করে ফেলেন- ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এডিট করা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি পড়ে কবি হুমাযুন কবির এবং লেখক আহমদ ছফা দুজনেই অভিভূত হয়ে হেলাল হাফিজকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, হেলাল হাফিজকে জীবনে আর কোন কবিতা না লিখলেও চলবে এবং এই একটি কবিতাই তাকে অমরত্বের দরোজায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁরা হেলাল হাফিজকে নিয়ে গেলেন তৎকালীন ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবিবের কাছে। কবি আহসান হাবিব কবিতাটি পড়ে বললেন, এই কবিতাটি তাঁর পত্রিকায় ছাপা যাবে না, ছাপালে তাঁর চাকরিটা চলে যাবে। তবে তিনি হেলাল হাফিজকে একথাও বলেন- “তোমার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে জীবনে তোমার আর কোনো কবিতা না লিখলেও চলবে।” শেষ পর্য্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্যোগে প্রকাশিত একটি একুশের সংকলনে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি ছাপা হয়। তরুন-ছাত্র সমাজের কাছে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে কবিতাটি এবং অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে শরীরে শিহরণ জাগা রোমাঞ্চিত হওয়া তারুণ্যের রক্তে ঢেউ খেলানো ও কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া অবিস্মরণীয় কবিতাটিকে তারা হটকেকের মতো লুফে নেন। সবার মুখে মুখে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের নোট বুক বা ডায়েরিতে কবিতাটি স্থান করে নেয়। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীরা নোট বুকে টুকে রাখতে এবং পড়ার ঘরে বা টেবিলে সাজিয়ে রাখতে গর্ব বোধ করতেন। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলি- আমি কিশোর বয়সেই কবিতাটির সাথে পরিচিতি হয়ে পড়ি। আমি কবিতাটির প্রথমে সন্ধান পাই আমার আপন বড় বোনের নোট বুকের মধ্যে- পাইলট কলম দিয়ে প্যালিকেন পারমানেন্ট ব্ল্যাক কালি দিয়ে সুন্দর করে লেখা ছিল। উল্লেখ্য আমার বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে কবি হেলাল হাফিজের ক্লাসমেট ছিলেন এবং এর জন্য তিনি গর্ববোধও করতেন। হেলাল হাফিজের ‘খোকাবাবু’ খেতাবটির কথা প্রথমে আমি আমার বড় বোনের কাছ থেকেই শুনেছি। কবি হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি পড়ে এবং ২ মার্চ ’৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় ছাত্রসমাবেশে গাঢ়ো সবুজের মধ্যে রক্তিম সূর্য্যের মধ্যে বাংলাদেশের স্বর্ণালি মানচিত্র খচিত শিহরণ জাগা নতুন পতাকা উত্তোলন দেখে- এছাড়াও ৭ মার্চ ’৭১ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে (উল্লেখ্য এ দু’টি ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছি) এ তিনটি বিষয় আমাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে যেতে দারূণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কবি হেলাল হাফিজের ৫৬টি কবিতা নিয়ে প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কবিতাপ্রেমী বিশেষ করে পরবর্তী বা নতুন প্রজন্মের মনে কবিতা পাঠের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে এবং অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং এই কবিতার বইটি ’৮৬-র বই মেলায় সর্বাধিক বিক্রীত বই এবং কবিতার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কবিতাগ্রন্থের এ ধরণের আকর্ষণীয় নাম একমাত্র কবি হেলাল হাফিজের পক্ষেই সম্ভব এবং কবিই বলতে পারবেন এ ধরণের ব্যতিক্রমধর্মী কাব্যিক নাম তিনি কোথা থেকে পেলেন! দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর ২০১২-এর ফেব্রুয়ারির বই মেলায় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কবিতার বই থেকে ৫৬টি সহ নতুন আরো ১৫টি কবিতা নিয়ে ‘কবিতা একাত্তর’ নামে আরেকটি কবিতার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এখানে কবি আমাকে নিজেই বলেছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উজ্জীবিত করার জন্য ইচ্ছে করেই ‘কবিতা একাত্তর’ নাম দিয়েছেন। ‘কবিতা একাত্তর’ কবিতাগ্রন্থটির সাথে সাথে ইংরেজি ভার্সনও যুক্ত রয়েছে। কবি হেলাল হাফিজের মতো কবিরা শুধু একবার- একবারের জন্যই আসেন। মাত্র তিন বছর বয়সেই তিনি মাতৃহারা হন এবং মাতৃহীনতার বেদনাই তাকে কবি করে তুলেছে। তাঁর ‘ফেরীঅলা’ অর্থাৎ ‘কষ্ট নেবে কষ্ট’ কবিতাটি পড়লেই সহজেই অনুমান করা যায় কত সুপ্ত গাঢ়ো নীল ব্যদনা এই লাজুক নিভৃতচারী কবির হৃদয়ের মধ্যে বিচরণ করছে। কবি হিসেবে তরুণ পাঠকদের এতো ভক্তি-ভালোবাসা, এতো আদর খুব কম কবির ভাগেই জোটেছে। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি পড়লে অবাক হতে হয় একজন মানুষের পক্ষে কী করে সম্ভব এধরণের কবিতা লেখা! তাহলে কি কবি হেলাল হাফিজ এই পৃথিবী কাঁপানো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি যখন লেখেছিলেন- তখন কি তাঁর মধ্যে কোনো ঐশ্বরিক বা অলৌকিক অথবা কোনো আধ্যাত্মিক অদৃশ্য শক্তি কাজ করেছিল- তা না হলে তিনি কী করে এধরণের অবিস্মরণীয় বিস্ময়কর কবিতাটি লিখলেন! অবশ্য সেটা এই জীবন্ত কিংবদন্তির কবিই ভাল বলতে পারবেন! আমরা কি তাঁর প্রথমে লেখা তিন/চার পৃষ্ঠাব্যাপী ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ সম্পূর্ণ কবিতাটি কি কোনোদিন পড়তে বা জানতে পারব না- তিনি সেখানে কী লিখেছিলেন? এই জনপ্রিয় ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি এখন শুধু বিশ্বের ত্রিশ কোটি বাংলাভাষাভাষী তারুণ্যকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে বা উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য কবিতা নয়- এটা এখন মানবতার পক্ষে লড়াইয়ের আহ্বান এবং সারা বিশ্বের মুক্তিকামী তারুণ্যের প্রতিবাদী ভাষা- যা কবিতার ইতিহাসে কবি হেলাল হাফিজ একটি স্থায়ী মাইল ফলক স্থাপন করেছেন- নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় -হেলাল হাফিজ এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শেষ্ঠ সময় এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। মিছিলের সব হাত কন্ঠ পা এক নয় । সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে, কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার। শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে, কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে। কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয় । যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান তাই হয়ে যান উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায় । এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় । লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ১৪ জুলাই ২০১৪ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >

পাঠক পছন্দ

Free Joomla Templates