News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার      
জাগো নারী প্রিন্ট কর
তাসনীম জাহান   
শনিবার, ৩১ আগস্ট ২০১৩

জাগোনারী ভবনআমার মেয়েকে প্লে-হাউজে ভর্তি করানোর জন্য 'জাগোনারী'তে প্রবেশ। প্রথমদিন ঢুকে বুঝতে পারলাম এই প্লে-হাউজটি পরিচালনা করছেন বাঙালী নারীরা। বুঝতে দেরী হলো না, প্লে-হাউজটি যে-সংগঠনের অংশ, অর্থাৎ জাগোনারী নামক উইমেন্‌স এডুকেশনাল রিসোর্স সেন্টারটিও বাঙালী নারীদের দ্বারাই পরিচালিত।

 বাঙালী নারীদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠন, তাও আবার বিদেশের মাটিতে! আমার খুব আগ্রহ জাগলো জাগোনারী সম্পর্কে জানার। সৌভাগ্যবশতঃ পরিচিত হতে পারলাম জাগোনারীর পরিচালিকা নূরজাহান খাতুনের সাথে। শৈশবে মা-বাবার সাথে বাংলাদেশ  থেকে  ব্রিটেই নে এসেছিলেন  নূরজাহান , তারপরে আর ফিরে যাওয়া হয়নি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারিনী এ-নারীর। বাঙালী নারীদের জন্য সামাজিক সমতা আনয়নের উদ্দেশ্যে কিছু একটা করার অদম্য আকাঙ্খা ছিলো তাঁর। আর তা থেকেই ২০০৩ সালে জড়িত হন জাগোনারীর সাথে।

নূরজাহান বলেন 'জাগোনারী হচ্ছে নারীদের জন্য একটি সেতু যা তাঁদেরকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়ে থাকে। এই সংগঠন থেকে নারীরা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়ে, নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে, অন্য দেশের কালচারের মধ্যে নিজেকে উপস্থাপণ করার মতো অবস্থান তৈরি করে নিতে পারেন’। তিনি মনে করেন 'প্রথমে নিজেকে  বুঝতে হবে, নিজের মূল্য বজায় রেখে, নিজের সংস্কৃতি, প্রথা ধ্বংস না করে, অন্য সমাজের সাথে মিশে মিশ্র-সমাজ গঠন করতে হবে'।

যুক্তরাজ্যে গত শতকের আশির দশকের দিকে বাঙালী নারীদের উন্নয়নের তাগিদে, তাঁদেরকে সামাজিক কর্মে আগ্রহী করার মাধ্যমে  সুস্থ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে সাহায্য করতে নারীরাই এগিয়ে এসেছিলেন নারীদের জন্য। নারীদের সুখ-দুঃখের অংশীদার এ-সংগঠনটি বাঙালী নারীদের হাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো ১৯৮০ সালে; যদিও, বাস্তবিক অর্থে এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৭ থেকে। পূর্ব-লণ্ডনে বাংলাটাইনের কাছেই ওয়াইটচ্যাপেল রোডে জাগোনারীর ভবন। হাতে গোনা কয়েকজন নারীকে সেবা প্রদানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও, বর্তমানে সপ্তাহে ৫০০ জন নারী জাগোনারীর  বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহন করছেন।

ব্রিটেইনের অচেনা পরিবেশে এসে বাঙালী নারীদেরকে যেন হোঁচট খেতে না হয়, সেজন্য নানা ধরনের তথ্য, প্রশিক্ষণ, সাপোর্ট, ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা  দিয়ে থাকে জাগোনারী। বর্তমানে বাঙালী নারীদের সাথে অবাঙালী নারীরাও কাজ করছেন এই সংগঠনটিতে। শুধু কি তাই ! তাঁরা আসছেন সেবা পাবার জন্যও। জাগোনারীর অপারেশন্‌স ম্যানেজার ফরাসী নারী ইসাবেল টেরিসন বলেন, 'বাঙালী নারীদের সাথে কাজ করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। বাঙালী নারীরা নিজেদের কমিউনিটি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন।

নানামুখী প্রকল্প পরিচালনা করছে জাগোনারী, সবগুলোই নারীদের জন্য বিনামূল্যে  প্রাপ্য। যেমন 'উইমেন এম্পাওয়ারড প্রৌজেক্ট', ইংরেজী শিক্ষার ইসল ক্লাস, মেণ্টরিং সাপোর্ট, ভলাণ্টীয়ারিং, প্যারেন্টিং কোর্স, আর্ট প্রজেক্ট, লাইফ স্কিল ইত্যাদি। নূরজাহান বলেন ‘বাঙালী নারীদের জন্য ইংরেজী ভাষা শিখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ’।  'পজিটিভলি ইন্ট্রিগেটেড' প্রৌজেক্টে নারীরা ইংরেজীর ভাষা, কম্পিউটার চালনা, বিভিন্ন ধরনের বাস্তবসম্মত বিষয়ে জ্ঞান আহরণ, ডিভিডি প্রজেক্টে অংশগ্রহন করতে পারেন। 'উইমেন এ্যাহেড' প্রৌজেক্টের আওতায় আইন লঙ্ঘনকারী নারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয়।

এরকম আরেকটি প্রৌজেক্ট হচ্ছে  'ডোমেস্টিক এবিউস উই ক্যান এণ্ড ইট '। এখানে নারীরা আবেগ-সম্পর্কিত সহায়তা ছাড়াও হাউজিং, ফাইনান্সিয়্যাল, লিগ্যাল এডভাইজ ইত্যাদি সহায়তা পেয়ে থাকেন। এ-প্রকল্পের  বিষয়ে  নূরজাহান বলেন, 'নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করার জন্য শক্তি প্রয়োগ না করে আলাপ-আলোচনার উপর বেশী জোর দেওয়া উচিত। এ-বিষয়ে স্থানীয় কমিউনিটি থেকে আমরা অনেক সমর্থন পাচ্ছি’।

জাগোনারীর ভবনে রয়েছে বিশাল একটি হলঘর, যা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। বর্তমানে বিভিন্ন নারী উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান এই সেন্টারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার মধ্যে ট্যুইষ্ট নামক প্রোগ্রাম, যুম্বা নামক নাচের প্রোগ্রাম, কনেল নামক চাকুরীর প্রোগ্রাম, বাচ্চাদের জন্য আরবী শিক্ষার প্রোগ্রাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। জাগোনারীতে বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য রয়েছে ‘ক্রেশ’ এর ব্যবস্থা - যেখানে মায়েরা তাঁদের বাচ্চা রেখে ক্লাস করতে পারেন। প্লে-হাউজের কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি, যেখানে দুই থেকে চার বছরের বাচ্চারা ভর্তি হতে পারে।

জাগোনারীর আরেকটি শাখা রয়েছে নিকটবর্তী ওয়াপিং এলাকায়, যা ‘ওয়াপিং উইমেন্স সেন্টার’ নামে পরিচিত। প্লে-যোন, সাইক্লিং প্রৌজেক্ট, সৌশ্যাল এন্টারপ্রনারশীপ প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়ে থাকে ওয়াপিং সেন্টারে। পরিচালিকা নূরজাহান , বর্তমান ইকোনোমিক ক্রাইসিসে নারীদেরকে সোশাল এন্টারপ্রাইজ এর দিকে ধাবিত হওয়ার পরামর্শ দেন।

চাহিদার কথা চিন্তা করে পরিচালিকা  নূরজাহান চাচ্ছেন জাগোনারীর প্রকল্পগুলো  আরও সম্প্রসারিত করতে, সেজন্য বোধ করছেন বাড়তি ফাণ্ডিং-এর প্রয়োজনীয়তা। নিজের দেশ বাংলাদেশেও জাগোনারীর মতো আরেকটি নারী-সংগঠন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি - বলেন 'বাংলাদেশী নারীর শিকড় যেখানে, সেখানে এ-ধরনের নারী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা আরও জরুরী'।

জাগোনারীর এসকল প্রকল্প থেকে নেয়া প্রশিক্ষণ অনেক নারীর জীবনের স্বপ্নগুলো পূরন করতে সহায়তা করছে। দীর্ঘ ২৫ বছর পাড়ি দিয়ে লণ্ডনের জাগোনারী এখন যেকোন দেশের নারীদের জন্য একটি অনুকরনীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের সব প্রান্তে যদি বাঙালী নারীদের জন্য জাগোনারীর মতো শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান থাকতো, তাহলে সব জায়গাতেই বাঙালী নারীদেরকে  তাঁদের উপযুক্ত স্থান করে নিতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারতো। আসুন না, নিজের কমিউনিটির জন্য আমরা হাত বাড়িয়ে দিই। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাঙালী নারী হিসেবে এটাই প্রত্যাশা।

সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর ২০১৩ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates