|

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনছেন, ইয়াহিয়া আমার বন্ধু, বাল্যবন্ধু! তবে ওর “আগা” নেই, মাথা আছে। কিন্তু একাত্তরে কি করতে গিয়ে সৈনিকদের লেলিয়ে দিয়ে কি কাণ্ডটাই না করলো! সেজন্যে তার নিজের ভোগান্তিও তো কম হয়নি। এর জন্য কিছুটা হলেও আমি দায়ী, আর সে কারণেই আমার যত অনুশোচনা। সে দুঃসহ কাহিনি* আর কোথাও বলা যাবে, অন্য কোন প্রেক্ষিতে, অন্য কোন সময়ে। আজ অন্য কথা।
কুমিল্লা থেকে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা মডেল স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে মুহম্মদ ইয়াহিয়াকে সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলাম। সেই থেকে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব আজ পঞ্চাশ বছর পরেও তেমনি রয়ে গেছে। স্কুলে সবসময় দ্বিতীয় হলেও (তাই বলে ভাববেন না যেন আমিই প্রথম হতাম) সবাই ওকে সবচেয়ে মেধাবী বলেই জানতাম। বন্ধু হয়েও সে আমাকে ‘মামু’ এবং ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করে। এক সময় দূর সম্পর্কের এক ভাগনে আমার সহপাঠী হয়ে একই ক্লাশে এসে মামু বলে ডাকায় তখন থেকে ইয়াহিয়ারও ‘মামু’ হয়ে গেলাম। ফলে ধীরে ধীরে সে আমাকে ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’ বলা শুরু করলেও আমি নতুন ভর করা এই ভাগ্নেকে ‘তুমি’তেই রেখে দিলাম। বছর বিশেক হোল যতবারই দেশে সময় কাটিয়েছি, তা সাত থেকে দশ দিনের বেশি ছিলনা। এবার প্রায় একমাস দেশে থাকা হবে বলে সময়টা কিভাবে কাটাবো ভেবে চিন্তা হছিল। ইয়াহিয়া অভয় দিয়েছিল, এই একমাস সময় কিভাবে চলে যাবে বুঝতেই পারবেন না। তার অফিসের আলমারিটা বিভিন্ন দুস্প্রাপ্য বই দিয়ে সাজানো। বলেছিল, রাতদিন এখানে বসে পড়ালেখা করতে পারবেন, ঢাকার সময় উপভোগ করে না কাটলে এটাই হবে আপনার চাকুরি। প্লেন থেকে নেমে গাড়িতে বাসায় ফেরার সময়ই ওর অভ্যর্থনামূলক ফোন পেলাম। বললো আমার বিশ্রাম হয়ে গেলে যেন জানাই, এসে নিয়ে যাবে। ঢাকার যে বাসায় আমি উঠবো তার পাশের বিল্ডিংএ ওর অফিস, এবং ওর বাসা অফিস থেকে এক ব্লক দূরে। কিন্তু নিজের ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সাতদিন চলে গেলেও আমার আর ফোন করা হয়নি। তবুও একদিন পরপরই সে আমার শারিরীক বিশেষ করে পেটের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছে। ওর নিজের স্বাস্থ্যটিও ভাল নেই, বছর পঁচিশ হোল হৃদপিণ্ডটি থেকে থেকে মেজাজ দেখায়, যখন তখন ধমক দিয়ে ওঠে। ‘লক্ষীসোনা চাঁদের কণা’, ‘আর ক’টা দিন সবুর কর’, ইত্যাদি বলে বলে সেটিকে শান্ত করে রাখা হয়। বেঁচে আছে কিনা তা জানতে মাঝে মাঝে আমেরিকা থেকে ফোন করে খোঁজ নেই। সেই আধমরা হৃদপিণ্ডটি নিয়ে সে যে কি করে এক বিশাল হৃদয়ের কাজ করে ফেললো তা চক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না! তার ওপর এবার ঢাকায় আমার সময়টি যেন উপভোগ্য হয় তার ব্যবস্থা করতে সে যা করলো, তা বর্ণনা না করলে আমার ঢাকা সফরের গল্পটাই অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। সেকথায় পরে আসছি।
ফজলুল হক হলে দেয়াল পত্রিকা বের করা, গল্প ও কবিতা লেখা, সিনেমা দেখা, রাতবিরেতে আড্ডা দেয়া, বামপন্থি ছাত্ররাজনীতি করা, রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা, আর সবসময়ে প্রচণ্ড প্রাণচাঞ্চল্যের হাসি নিয়ে সে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্র। রাজনীতি করা থেকেই শিখেছিল জনসেবা করতে, আর বিশেষ করে মাথায় ঢুকেছিল যে আমাদের মেয়েদের শিক্ষিত-স্বাবলম্বী করে না তুললে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। চুয়াত্তর সনে যখনো আমার ছাত্রত্ব শেষ হয়নি, সে তখন ষ্ট্যাটিষ্টিক্সে মাষ্টার’স শেষ করে সদ্য জন্ম নেয়া, আজকের বিখ্যাত ও দ্বিখণ্ডিত ‘প্রশিকা’ নামের এনজিও’কে গড়ে তোলা শুরু করেছিল। সেই যে সময়ে আমাদের গ্রামের মহিলারা নিজ পরিবারের বাইরের কোন পুরুষের সাথে কথা বলাতো দুরের কথা, তাদের দেখলে মাথায় তিনহাত ঘোমটা দিয়ে দূর দিয়ে চলে যেতো, সেই ‘প্রাগৈতিহাসিক’ যুগে গ্রামে বসেই সেসব স্বল্পশিক্ষিত মহিলাদের নিয়ে মাসব্যপী কর্মশালা করে করে তাদের সামাজিক অধিকার ও স্বাবলম্বী হতে প্রশিক্ষণ দিত। গতানুগতিক শিক্ষা যে আমাদের ছাত্রদেরকে মুক্তচিন্তা করতে না শিখিয়ে কারখানার শ্রমিক বানিয়ে তোলে, তার প্রতিকার করতে কর্মশালা করতো। সেই দিনগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটিতে সে আমার ছাত্রাবাসে চলে এলে রাত জেগে জেগে ওর সেই বিপ্লবাত্মক কাজকর্মের কথা তন্ময় হয়ে শুনতাম!
প্রশিকা ছেড়ে একসময় সে জাতিসঙ্ঘের উন্নয়নমূলক কাজে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় পনেরো বছর কাজ করে। ফলে আন্তর্জাতিক এবং পাখির দৃষ্টিতে (বার্ড’স আই ভিউ) বাংলাদেশের সমস্যাগুলো দেখা ও বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও অর্জন করে। এক সময়ে সে প্রফেসর ইউনুসকে ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল। ক্ষুদ্রঋণ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যে গঠিত ‘গ্রামীণ ট্রাষ্ট’ সৃষ্টির প্রথম দিকে এর জেনারেল ম্যানেজার এর দায়িত্ব পালন করার সময় নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রথম “মাইক্রোক্রেডিট সামিটে” ক্ষুদ্রঋণ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিমন্ত্রিত হয়ে যোগ দেয়। সেটি সেই ১৯৯৬ সনের কথা।
পরের বছর যখন ‘সিডিএফ’ (ছয়শত ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনাকারী যেমন ব্র্যাক, প্রশিকা, ইত্যাদি’র সমন্বয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় সংস্থা) এর প্রধানের (এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর) দায়িত্ব পালন করছিল, তখন ওয়াশিংটন ডিসি’তে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় মাইক্রোক্রেডিট সামিট এ অংশগ্রহণ করে। সেসময় ক’দিন মেরিল্যাণ্ডে আমার সাথে কাটিয়েছিল। সুযোগ পেয়ে ওর হাত দিয়ে ক্ষুদ্রঋণের ওপর একটি লেখাও আদায় করে নিয়েছিলাম। ইয়াহিয়া বহুদিন বিদেশে থাকার ফলে সেসব দেশে বাংলাদেশের সরকারি আমলাদের কার্যকলাপ খুব কাছে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। আক্ষেপ করে বলতো, আমরা বিদেশি ঋণ নিতে এতো উদ্গ্রীব থাকি যে দেশের স্বার্থ চিন্তা করার সাহস আর থাকেনা। অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঋণ আমাদের কোন উপকারেই আসেনা অথচ মাথা নীচু করে তা গ্রহণ করি। (ইদানিং ডঃ ইউনুসের “ব্যঙ্কার টু দা পুওয়োর” বইতেও হুবহু একই কথার পুনরাবৃত্তি ও বর্ণনা দেখলাম)। সে আরো বলেছিল যে, দেশগ্রামের লোকজন একটি চাকুরি দেয়ার জন্যে ধন্না দেয় অহরহ। ‘আচ্ছা বলুন দেখি আমার কি জমিদারি বা ব্যাবসা বা কারখানা আছে যে তাদের চাকুরি দেব’?
অনেক ক’টি গ্রামের অর্থনীতি জরিপ করে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে আমাদের গ্রামের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে যে টাকা আছে তা সমবায়ের আওতায় আনা গেলে যে পুঁজির সৃষ্টি হবে, তা ব্যবহার করে ক্ষুদ্রঋণ চালু করে গ্রামের ছেলের চাকুরি গ্রামেই করে দেয়া সম্ভব! বলল, তাই নিজেই একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবছে। বললাম, তাহলে প্রফেসর ইউনুসের সাথে কাজ করতে তোমার বাধা কোথায়? বললো কোনই বাধা নেই, তবে আলাদা এনজিও হলে বাইরের কারো দান বা সাহায্য ছাড়া নিজস্ব সম্পদ দিয়ে সমস্যা সমাধান করার আমার এই ধারণা বা হাইপথেসিসটি সঠিক কিনা তা যাচাই করতে পারবো। ডঃ ইউনুসের মত শুধুমাত্র হতদরিদ্রকেই ঋণ দেয়ার পরিবর্তে ওর গ্রাহকরা হতদরিদ্রের ঠিক ওপরে, কিছুটা স্বচ্ছল পরিবারও অন্তর্ভুক্ত হবে কারণ ওদের সঞ্চয় দিয়েই সেই সমবায়ের মুলধন তৈরি হবে। হয়তো ভদ্রতা করে, হয়তোবা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে হাত দেয়ার আগে সাহস পেতে আমার অভিমত জানতে চেয়েছিল। সারা জীবন বাঁধা-বেতনে চাকুরি করার ফলে আমি কোন নির্ভরতার কথা বলতে পেরেছিলাম বলে মনে পড়েনা। তবে খুব শীঘ্রই সে “উন্নত জীবন-কৌশল শিখিয়ে ও ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে আমাদের উপেক্ষিত জনগোষ্ঠি, বিশেষ করে নারী সমাজের দারিদ্র্য বিমোচন এবং জীবনধারণের মান উন্নয়ন” এই লক্ষ্য সামনে রেখে “সিডিপ বা সিডিআইপি - সেণ্টার ফর ডেভালাপমেণ্ট ইনোভেশণ এণ্ড প্র্যাক্টিসেস” নামে একটি এনজিও দাঁড় করিয়ে ফেললো।
বছর দুই পর ফোন করলে ফজলুল হক হলের করিডোর থেকে ভেসে আসা, সিকি শতাব্দী আগে শোনা, সেই উচ্ছ্বসিত হাসি আবার শুনতে পেলাম। বললো আমাদের গ্রামের মাঝেই যে জনসাধারণের জীবনের মান উন্নত করার মূলধন লুকিয়ে আছে, নিজের সেই হাইপোথেসিসকে সে ইতোমধ্যেই সত্য বলে প্রমাণ করেছে! ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের নিকটবর্তী একটি গ্রামে শুরু করে সে তার সমবায় কার্যক্রম আশেপাশের পনেরোটি গ্রামে চালু করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে অন্য কোথা থেকে সাহায্য ছাড়াই গ্রাম থেকে গড়ে তোলা মূলধনের টাকাতে গ্রামের আটজন যুবকের চাকুরিরও ব্যবস্থা করা গেছে। তাই সে আজ এতো খুশি!
২০০৩ সনে দেশে গেলে সে আমাকে ঢাকার অদূরে গাজিপুরে দুই বিঘা জমির ওপর তাদের একটি ‘সেণ্টারে’ নিয়ে গেল। ওখানে কয়েকঘণ্টার জন্য আলাদিনের চেরাগ হাতে নিয়ে আমি হয়ে গেলাম হাতেমতাই বা এক তুঘলকি সুলতান! জীবনে যে আমি একসাথে লক্ষ টাকা কখনো ছুঁয়ে দেখিনি, সেই আমি গোছা গোছা টাকা অন্যের হাতে তুলে দিতে লাগলাম! টাকা দিয়ে কি করবে তা বর্ণনা করে সেদিন প্রায় পঁচিশজন মহিলা গ্রাহক আমার হাত থেকে পাঁচ থেকে দশ হাজারের মোট দেড় লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে গেল। কেউ বললো, একেকটি পনের টাকা দরে তিনদিন বয়েসি পাঁচশত মুর্গির ছানা ও তাদের খাবার কিনবে। ছোট্ট একটু যায়গায় আবদ্ধ ছানাগুলোকে স্বামী-স্ত্রী রাতদিন পালা করে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে, ঘড়ি ধরে খাইয়ে ও তাদের বিষ্ঠা পরিষ্কার করে, কোনটি অন্যগুলোর পায়ের নীচে পড়লে তাকে সাথে সাথে উদ্ধার করে বাঁচিয়ে তোলে। এভাবে পরিচর্যা পেয়ে চার থেকে পাঁচ মাস পর ছানাগুলো বড় হলে প্রতিটি তিনশত টাকা দরে বিক্রয় করবে। আরেকজন বললো স্বামী প্রতিটি সাপ্তাহিক হাটে তার বানানো বিরিয়ানি বিক্রয় করেন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেশি পরিমাণে সুগন্ধি চাল, ঘি ও খাসির মাংস কিনতে সে ঋণ চাইছে। আরেকজন যার ঋণের পরিমাণ পনের হাজার টাকা, সে ছোট্ট এক টুকরা জমি কিনবে সবজিক্ষেত করার জন্য। জীবনের প্রয়োজন মেটাতে আমাদের সহজ সরল মানুষেরা যে কত বিচিত্র ও সৃজনশীল পন্থা খুঁজে বের করে, মাত্র একটি দিনের এই তিন ঘণ্টা সময়ে তা হাজারো মুগ্ধতা নিয়ে আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে রইলো। মনে হয়েছিল এর আগে আমার পঞ্চাশোর্ধ সেই জীবনের পড়া সব বই-পুস্তক একত্র করেও বাংলাদেশ সম্পর্কে এতো গভীর ভাবে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভবপর হয়নি!
ঋণদানের অনুষ্ঠান শেষ হলে প্রায় দশজন ফিল্ড অফিসার, সুপারভাইজার, লোন অফিসার, এবং অডিটর টেবিলে আমার চারপাশে বসে তাঁদের ‘সিডিপের’ কর্মসূচি বর্ণনা করলেন। প্রথমে গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্তদের তাদের ছেলেমেয়ের শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হোল। স্কুল শেষ করে কলেজে ঢুকলেই বেতন ছাড়াও পড়ার বই-খাতা-পেন্সিল ও আনুষঙ্গিক জিনিষের জন্য টাকার প্রয়োজন হবে। আর কতবছর পরে তাদের ছেলেটি বা মেয়েটি কলেজে যাবে হিসাব করে এখন থেকেই তাঁরা এই ‘সিডিপ’ সমবায়ে টাকা জমাতে পারেন। ‘সিডিপ’ সময়মতো সুদসহ সেই টাকা ফেরত দেবার গ্যারাণ্টি দেবে। জমানো টাকার বিপরীতে তাঁরা অথবা যাদের সন্তানের লেখাপড়ার খরচের প্রয়োজন নেই, সবাই ‘সিডিপ’ এর অংশিদারিত্ব (শেয়ার হোলডার) পাবেন। প্রয়োজনে এই অংশিদাররা একেবারে হতদরিদ্র থেকে মাঝারি ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তার মতোই এই সমবায় ফাণ্ড থেকেই কিছুটা বেশি সুদে টাকা ধার নিতে পারবেন। পাঁচ থেকে পনের হাজারের এই ঋণের টাকা ছাব্বিশটি সমান কিস্তিতে শোধ করতে হবে। ইয়াহিয়ার সারা জীবনের সঞ্চয় সাতলক্ষ টাকা সম্বল করে যে ফাণ্ডটি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি মাত্র গ্রামে যাত্রা শুরু করেছিল, অচিরেই বিশটি গ্রামের মানুষ তার অংশিদার হয়ে গেল। সিডিপের অনুপ্রেরণায় নিম্নমধ্যবিত্ততো বটেই, দিনমজুর ও ছিন্নমূল পরিবার গুলোও তাদের শিশুদের সরকারি অবৈতনিক স্কুলে পাঠাতে শুরু করলো। পুরো দুইটি বছর কারো কাছে ভিক্ষা বা ধার না করেই গ্রামের এই মানুষগুলো স্বাবলম্বী হয়ে একটু একটু করে উন্নত জীবনের দিকে এগিয়ে গেল।
সিডিপের এই সাফল্যে প্রতিবেশি গ্রামে তাদের কাজ সম্প্রসারণের অনুরোধ ও দাবি আসতে লাগলো। ঠিক এই সময়ে ইয়াহিয়া ও অন্যান্য পরিচালকরা অনুভব করলেন, যদিও অল্প কয়েকটি গ্রামে নিজেদের জমানো সমবায়ের টাকা দিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব, সংস্থাটি বেশি বড় হয়ে গেলে তার জন্য যে অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে তা নিম্নমধ্যবিত্তের জমানো টাকায় কুলোবে না। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই এর একটি প্রতিকারও নিজ থেকেই সামনে এসে গেল। বাংলাদেশ সরকার ‘পিকেএসএফ’ বা পল্লী-কর্ম-সহায়ক-ফাউণ্ডেসন এর মাধ্যমে অত্যন্ত অল্প সুদে (৪.৫%?) মহিলা-খদ্দের প্রধান সমবায় সমিতিগুলোকে টাকা ধার নিতে অনেক সহজসাধ্য করে দিলেন। সিডিপ সেই থেকে ‘পিকেএসএফ’ এর টাকা ধার নিয়ে তাদের কার্যক্রমের পরিধি অনেক বাড়িয়ে দিল। শুরু থেকে পনেরো বছরেই তারা বাংলাদেশের তেরোটি জেলার একুশ শত গ্রামে তাদের সেবা ছড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এক লক্ষ তের হাজার পরিবারকে এই সেবা দেয়া হচ্ছে।
এবার দেশে গিয়ে ঢাকার রাস্তা, পার্ক, এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আবর্জনার চক্ষুশুল দৃশ্যে ও গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে ইয়াহিয়াকে বললাম, কিভাবে করবে জানিনা তবে এর একটা বিহিত তোমাদের করতেই হবে। আমার কথা শেষ হওয়ার আগে থামিয়ে দিয়ে বললো, গতবার আপনি বলেছিলেন প্রতিদিন শিশু-ছাত্রদের যেন খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে নেয়ার কথা শেখানো হয়। আপনি শুনে সুখী হবেন যে আমাদের আড়াই হাজার “শিক্ষা-সহায়ক” স্কুলের চার থেকে সাত বছর বয়েসি ষাট হাজার ছাত্রছাত্রী এটি শিখছে প্রতিদিন। মুগ্ধ ও বিস্মিতভাবে তাকিয়ে বললাম, তাই নাকি, কই আমি তা কখন বলেছিলাম মনেতো পড়ছেনা! ধীরে ধীরে ওর সাথে গতবারের ঘণ্টা দুয়েকের সাক্ষাতের কথা মনে পড়লো।
বছর ছয়েক আগে ঢাকায় সদ্য-তৈরী বসুন্ধরা মলের আটতলায় বসে ইয়াহিয়ার সাথে গল্প করছিলাম। ও বলেছিল গ্রামের মানুষের মাঝেতো তাদের ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠানোর প্রবণতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু মুশকিল হোল হতদরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারের শিশুরা অল্পদিনের মাঝেই স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। সরকারি অবৈতনিক স্কুলগুলোয় শিক্ষকের সংখ্যা ছাত্রের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় তারা স্কুলে যতটা না শেখাতে পারেন, তার চেয়ে ঢের বেশি বাড়ির কাজ বা হোমওয়ার্ক দিয়ে থাকেন। দরিদ্র-অশিক্ষিত মা-বাবা এব্যপারে তাদের ছেলেমেয়েদের কোন সাহায্যই করতে পারেননা। পড়া না শিখে পরদিন স্কুলে গিয়ে শিশুটি প্রথমে শিক্ষকের, পরে সহপাঠীদের তাচ্ছিল্যের শিকার হয়। অপমানিত হয়ে সে এরপর আর স্কুলে যেতে চায়না। ইয়াহিয়া বললো, আমাদের মত গরিব দেশে সরকারকে আর কত দোষ দেয়া যায়? আমাদেরই একটা প্রতিকার বের করতে হবে। এমন সময় চায়ের সাথে সিংগারা এলে আমার হাত ধোয়ার প্রয়োজন হলে বললাম, এর প্রতিকার করতে গিয়ে যদি তুমি একটি নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা কর তবে আমার একটি অনুরোধ আছে। ক্লাশে ছাত্রদেরকে যেন “প্রতিবেলা খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে খেতে হবে” অন্ততঃ দিনে একবার করে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। কথাপ্রসঙ্গে বলা আমার সামান্য একটি কথাকে যে সে এতো গুরুত্বের সাথে নিয়েছে, আজ তা দেখে খুব আশ্চর্য এবং কৃ্তজ্ঞও হয়েছিলাম!
ঝরে পড়া হতভাগা সেই শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য সিডিপ একটি ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’র নিজস্ব, অভিনব এবং অসামান্য একটি “শিক্ষা-সহায়ক” পথ বের করেছে। অষ্টম থেকে ওপরের যেকোন শ্রেণীর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন বেকার মেয়ে বা গৃহবধুকে শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে হবে। সেই শিক্ষিকা প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য একটি সরকারি স্কুলের কাছে গাছতলা বা বাড়ির উঠান হোক, খালি গুদামঘর বা স্কুলের অব্যবহৃত কক্ষই হোক, নিজ উদ্যোগে তা জোগাড় করবেন। শিক্ষিকা সরকারি স্কুল ছুটি হলে দুইঘণ্টার জন্য হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের প্রাইভেট টিউটর হয়ে তাদের ‘বাড়ির কাজ’ শেষ করতে সাহায্য করবেন। তিনি নিজে কোন স্কুলে শিক্ষকতা করতে পারবেন না এবং এরকম একটি ক্লাশে পঁচিশজনের বেশি ছাত্র থাকতে পারবেনা। পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি সিডিপ থেকে মাসিক পাঁচশত টাকা পাবেন, আর ছাত্র-পিছু পনের থেকে কুড়ি টাকা করে অভিভাবক থেকে নিতে পারবেন। এই ব্যবস্থায় ছাত্রটির স্কুল-পালানো বন্ধ হবে। একই সাথে শিক্ষিত হয়ে বেকার বসে থাকা গ্রামের অনুঢ়া মেয়েটির বা উপার্জনহীন গৃহবধুটির একটি আয়ের ব্যবস্থা হবে।
সিডিপ প্রতিটি শিক্ষিকার ইণ্টারভিউ নিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে, সর্বশেষে ছাত্ররা মাটিতে বা মেঝেতে বসার একটি প্লাষ্টিকের মাদুর, বই-খাতা-কলম, একটি ব্ল্যাকবোর্ড ও একবাক্স লেখার চক হাতে দিয়ে শিক্ষিকা নিয়োগ দেয়। গ্রামের মেয়েদের এটাও বলা হচ্ছে, এই আইডিয়া বা বুদ্ধি ব্যবহার করে তাঁরা নিজেরাই একটি প্রাইভেট স্কুল খুলে চালাতে পারেন, সিডিপের সাহায্য ছাড়াই। ইয়াহিয়া বললো, মাত্র এই কয়েক বছরে প্রকল্পটি এতো সফল হয়েছে যে তাঁদের ছাত্ররা আর সরকারি স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ছেনা। বেকার বসে থাকা মহিলারা ‘শিক্ষকতা’র মহৎ পেশায় নিয়োজিত হওয়ায় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা অনেক ওপরে উঠে গেছে, গ্রামের লোকজন সুচিন্তিত মতামত জানতে তাঁদের দ্বারস্থ হচ্ছে। আর উপার্জনক্ষম হওয়ায় যারা সুশ্রী নন, তেমন অনুঢ়া মেয়েদের বিয়ের পাত্র পেতে কম অসুবিধা হচ্ছে! পুরো কাজটিতে তাঁদের সাফল্য দেখে পিকেএসএফ অন্যান্য সংস্থাকেও এই পদ্ধতিতে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করলো। সিডিপের প্রশিক্ষণ পেয়ে বর্তমানে দেশের পয়ঁত্রিশটি সংস্থা সারা বাংলাদেশে এই কর্মসূচীটি প্রয়োগ করেছে।
এবার ঢাকায় আমার থাকাটা যেন উপভোগ্য হয় তা চিন্তা করে, আমার সাথে পরামর্শ করে, ইয়াহিয়া কুমিল্লা একাডেমিতে দুদিনের একটি সম্মেলনের ব্যবস্থা করলো। প্রথমদিন কুমিল্লা জোনের প্রায় তিনশত সিডিপ কর্মকর্তা নিয়ে, পরদিন কুমিল্লায় তাদের “শিক্ষা-সহায়ক” কার্যক্রমের তিনশত শিক্ষিকা নিয়ে। সম্মেলনের আগের দিন আমরা ময়নামতির ঐতিহাসিক যায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখবো। বলেছিল, প্রতিবারতো আপনার সাথে শুধু দুইএক ঘণ্টার বেশী দেখা বা কথা হয়না, এবার কুমিল্লার কোটবাড়িতে ক’দিন একসাথে থাকা হবে বলে আমরা আবার সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারবো। দুইসপ্তাহ ধরে সম্মেলনের জোগাড়যন্ত্র শেষ হলে দুর্ভাগ্যবশতঃ শেষ মুহুর্তে কিছুটা অসুস্থতার জন্য আর কিছুটা “অনিবার্য কারণবশতঃ” আমার কুমিল্লা যাওয়া হোলনা! বুঝতে পারছিলাম তাঁদের এতোদিনের উৎসাহ ও আয়োজনকে ম্লান করে দিয়ে আমি এক ভয়ানক অপরাধ করে ফেলেছি!
তারপরও ভগ্ন হৃদয়ের এই বন্ধু হৃদপিণ্ডটিকে তার শরীর থেকেও বড় করে, আবারো আমার সাথে হাসিমুখে কথা বললো। পরে অল্প সময়ের জন্যে একদিন ওর অফিসে গেলে সব জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের সাথে নিয়ে ছোটখাট একটি অধিবেশনের ব্যবস্থা করলো। তাঁরা জানালেন, আর যেসব প্রকল্পের মাধ্যমে সিডিপ জনসেবা করে যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, খাদ্যে আমিষের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে “গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প”, “মানব-সম্পদ (ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও সৃজনশীল ক্ষমতা) উন্নয়ন”, “পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন”, “প্রশিক্ষণ সেণ্টার ও প্রশিক্ষণ প্রদান”, ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের “সঞ্চয় কার্যক্রম”, এবং সমবায় সদস্য-সন্তানদের “মেধাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা বৃত্তি প্রদান”। সোনারগাঁওয়ে স্থাপিত নিজস্ব প্রশিক্ষণ সেণ্টারটিতে ইতোমধ্যেই ওরা প্রায় সাড়ে পাঁচহাজার শিক্ষার্থীকে পনেরটি বিষয়ে ‘এক থেকে তিনদিনের’ তিনশত ব্যাচে মানব সম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষাদান করেছেন। নিজদের ব্যবহার ছাড়াও এই প্রশিক্ষণ সেণ্টারটির আধুনিক সুবিধাদি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন “ব্র্যাক” তাদের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করছেন।
ঢাকা শহরের বুকে নয়শত লোকের এই প্রতিষ্ঠানটির এখন একটি নিজস্ব ভবন নির্মানের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। তাঁদের সৌজন্য ও অর্থায়নে একজন স্বনামধন্য সাহিত্যিক বাংলাদেশে শিক্ষান্নোয়নের ওপর গবেষণা করছেন। শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে আমাদের অবহেলিত দেশীয় সম্পদকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অধিক ব্যবহারযোগ্য করার পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। (তাঁদের উৎসাহ দেখে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সাথে ওর যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিয়ে এসেছি।) সবশেষে আমাকে দিয়ে কিছু কথা বলিয়ে তাঁরা আমার হাতে কিছু উপহার তুলে দিলেন। বাইরের কারো দান, অনুদান বা আর্থিক সাহায্য ছাড়াই দেশের সমস্যা সমাধান করার যে প্রত্যয় নিয়ে ইয়াহিয়া তার যাত্রা শুরু করেছিল, আজও তা বজায় রেখেছে। হে বন্ধু, হৃদয়টি তোমার আরো বড় হোক, আর সেই হৃদয়ের ছায়াতলে সারা বাংলাদেশ তার সমস্যা সমাধান করুক, এই কামনা করি। তুমি দীর্ঘায়ূ হও, সুস্থ থেকো। *একাত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বোমা মারতে গিয়ে (না)পাক সেনাদের হাতে আরো কয়েকজনের সাথে বন্দী হয়ে, শারিরীকভাবে প্রচণ্ড অত্যাচার সয়ে, অপ্রত্যাশিত ভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিল। ২৬শে জুন, ২০১২
মেরিল্যণ্ড, আমেরিকা। |
Comments
RSS feed for comments to this post